শনিবার, ফেব্রুয়ারি ২২, ২০২৫

ভাষার প্রসাদগুণ

 মাদের ভাষা আমাদের মাটির মতই প্রাচীন। তবে পৃথিবী যেমন বিবর্তিত হয়, সমাজ যেমন বিবর্তিত হয়, তেমনি ভাষাও। বিজ্ঞজনের মতে পাল আমল থেকে প্রাচীন বাংলার উৎপত্তি। তার আগে যা ছিল তা আর্যদের নিজস্ব, তাতে হয়ত দ্রাবিড়, কোলের মত অনার্য ভাষার উপাদান কিঞ্চিৎ মিশেল থাকতে পারে, তবে তা বাংলা নয় । পাল বংশ শুধু আদি বাংলার বিকাশ ঘটায়নি, এ যুগে শুরু হয়েছে সাহিত্য রচনা, তবে তা পদাবলীর আদলে। আর আমাদের ভাষার প্রসাদগুণ এখান থেকেই শুরু। সেটা নিয়েই এই পোস্ট।

আমরা অনেক সময় বলি, ছেলেটি/মেয়েটি/লোকটি সুন্দর করে কথা বলে। বা অমুখ লেখক সুন্দর লেখে। অর্থ্যাৎ তারা শব্দগুলোকে কাব্যিকভাবে বিন্যাস করে, যা শ্রতিমধুর ব্যঞ্জন সৃষ্টি করে, শুনে কানের আরাম হয়, চিত্ত উদ্বেলিত হয়। একটি বাক্য ধরা যাক, বাইরে খুব বাতাস উঠছে, একে আর কীভাবে বলা যায়? তীব্র বাতাস বইছে চারিধারে? অথবা বাতাস উঠেছে হাটুভাঙ্গা সিংহের মতন। তেমনি, কিছু মানুষ বাগান থেকে গোলাপ তুলছে, কবিরা বলবে- বাগানে গোলাপ তোলার উৎসব। কেউ অভিমান করেছে- কবিরা বলবে বুক জুড়ে আছে অভিমানের বাষ্প।
বলছিলাম প্রাচীন বাংলার পদাবলীর কথা। চর্যাপদের কথাই ধরা যাক। একটি পদ আছে এমন- দুহিল দুধু কি বেন্টে ষামায়? মানে হচ্ছে গরুর বাট থেকে বের হওয়া দুধ কি আবার ফিরিয়ে নেয়া যাবে? আমরা যেমন বলি, টুথপেস্ট টিউব থেকে বের হলে তা আর ফিরিয়ে নেয়া সম্ভব নয়, অথবা যে গুলি ছোড়া হয়েছে তা ফেরত নেয়ার উপায় নেই। গরুর বাট বিষয়টিতে নান্দনিকতা হয়ত নেই, তবে এটা চর্যাপদের একটি পদ বিধায় এর গুরুত্ব উপেক্ষা করা যায় না। আগেকার আমলের কবিরা উপমা দিতে এরকম প্রাণীকুলের উল্লেখ করতেন। মধ্যযুগের কবি শাহ মুহাম্মদ সগীর মাতৃস্নেহের উপমা দিতে গিয়ে বলেছেন - পিঁপিড়ার ভয়ে মাও না থুইলা মাটিত। পিঁপড়া কামর দিবে বলে মা তার সন্তানকে মাটিতে শুইতে দেয় নাই- এরূপ মাতৃস্নেহ।
এরপর যখন আধুনিক যুগ শুরু হলো। কবিদের লেখায় ধীরে কিন্তু নিশ্চিন্তে নান্দনিকতার সৃজন হলো। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন- কালের যাত্রার ধ্বনি শুনিতে কী পাও ? তারই রথ নিত্যই উধাও। বাংলায় তৎসম তদ্ভব মিলিয়ে বিশাল শব্দভাণ্ডার রয়েছে। এগুলোই পারমুটিশন কম্বিনেশন করে সৃজনশীল রূপ দিতে হবে কবিতায়, গল্পে। লেখক এখানে স্বাধীন। কোন নিয়ম নেই। গানে যেমন সি-কর্ডের পরে এ-মাইনর কর্ড না দিলে অন্যায় হবে। কবিতায়, গল্পে, গদ্যে সেই নিয়মের বালাই নেই। রবি ঠাকুরের গুরুগম্ভীর কবিতার চরণ বাদ দিলেও - অতি সাধারণ যে প্রাকৃতজনের বাংলা, সেখানেও শব্দের সুচারুবিন্যাস ঘটিয়ে অতি নান্দনিক পদ সৃষ্টি করা যায়, করেছেনও তাই। রবীন্দ্রনাথ শেষ জীবনে লিখেছেন- রূপনারানের কূলে জেগে উঠিলাম, জানিলাম এ জগৎ মিথ্যে নয়। একটাও ভারি শব্দ নেই, কিন্তু শুনতে কী দারুণ - আর তার গুঢ় ভাবার্থের কথা কী বলব?
শব্দ নিয়ে খেলায় সবার চেয়ে কয়েক ক্রোশ এগিয়ে আছেন আমদের জীবনানন্দ দাশ। কী কথা তাহার সাথে তার সাথে ? একটি সর্বনাম পদের সাধু ও চলিত রূপ ব্যবহার করে কী অসাধারণ একটি বাক্য গঠন করলেন। আরেকটি পদের কথা ধরুন। সেখানে মৃত্যুকে ঘুমের সাথে তুলনা করেছেন কবি - এই ঘুম চেয়েছিলো বুঝি! রক্তফেনামাখা মুখে মড়কের ইঁদুরের মতো ঘাড় গুঁজি। উকিল মুন্সীও অবশ্য মৃত্যুকে ঘুমের সাথে তুলনা করে লিখেছেন - সোয়া চাঁন পাখি আমি ডাকিতাছি তুমি ঘুমাইছ নাকি? উকিল মুন্সির মত সুফিবাদী কবিয়ালরাও সেই মধ্যযুগ থেকেই শব্দ নিয়ে খেলছেন। শব্দকে বিন্যাস করছেন সহজীয়া উপায়ে।
গদ্য এসেছে অনেক পরে। ১৮শ শতকে খ্রিস্টধর্ম প্রচারকদের প্রচেষ্টায় বাংলায় প্রথমবারের মতো গদ্য-ভাষার কার্যকর ব্যবহার শুরু হয়। সাধু ও চলিতের দোলাচলে অনেকদিন চলে শেষ পর্যন্ত চলিত কালের যাত্রায় টিকে আছে। আমরা আধুনিক গদ্য পেয়েছি। এখানেও রয়েছে ভাষার প্রসাদগুণ। শব্দগুলোকে বাক্যের কোন জায়গায় বসাবেন, কোন ধরণের শব্দ বসাবেন সেটি গদ্যেও সমভাবে গুরুত্বপূর্ণ। হৈমন্তি গল্পে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন- মেয়ের বয়স অবৈধ রকমে বাড়িয়া গেছে বটে, কিন্তু পণের টাকার আপেক্ষিক গুরুত্ব এখনো তাহার চেয়ে কিঞ্চিৎ উপরে আছে। এখানে আপেক্ষিক গুরুত্ব একটি সাইন্টিফিক টার্ম, আর্কিমিডিস থেকে এসেছে। কিন্তু সেটাও বাক্যের সৃজন বৃদ্ধিতে নির্দ্বিধায় ব্যবহার করা গেল। সহজভাবেও নান্দনিক বাক্য গঠন করা যায়, কবিতার মতই। সুনিলের লেখা পড়েছেন সবাই। তাঁর বাক্যগুলো সরল হলেও হাওয়াই মিঠাইয়ের মত মিষ্টি। কেমন যেন একটা আবেশ জড়ানো থাকে। অন্যদিকে শীর্ষেন্দু শব্দ নিয়ে বহুবছর রিসার্চ করেছেন, শব্দকে ভেঙ্গেছেন গড়েছেন। তাইতো তার লেখগুলো এত শক্তিশালী। মানিক বন্দোপাধ্যায়ের কথা না উল্লেখ করলে রীতিমতো অপরাধ হবে। রবীন্দ্রনাথ যেমন কঠিন এবং সহজ দুভাবেই বাক্যে মনন-সৃজন এনেছেন। মানিকও তাই। শেষতঃ উল্লেখ করব আমার মতে বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে বড় গদ্যকার, হয়ত সবচেয়ে বড় লেখক , অন্তত ভাষাকে বুননের দিক দিয়ে- সতীনাথ ভাদুরী। তার লেখার নান্দনিকতা স্পট অন। আমাদের দেশের অনেক শক্তিশালী লেখকরাও ভাষায় প্রসাদগুণ আনতে পারেন নাই, ইহাই প্রকৃত বাস্তব। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ উপন্যাসে সাচিবিক বাংলা লিখেছেন, মনে হবে সরকারি প্রজ্ঞাপনের শব্দ পড়ছি। তবে উনি অনেক বড় লেখক, হয়ত এ বাংলার শ্রেষ্ঠ এই মর্মে যে, মানব মনের অতল গভীরের বিষয় নিয়ে নাড়াচাড়া করেন, রুশ লেখকদের মত। শব্দের ব্যবহারে উনি সঠিক হলেও, সেই শব্দগুলো শতভাগ ব্যকরণ মেনে তৈরি করা হয়েছে, একুরেসি আনতে গিয়ে ঘাটতি হয়েছে প্রসাদগুণের । অন্যদিকে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস করেছেন শব্দের অতিবিন্যাস, ওনার গদ্য হচ্ছে না গদ্য না পদ্য। বড় লেখক তবে এক ফোঁটার জায়গায় পাঁচ ফোটা ঢাললে যা হয়। বরং শব্দকে সঠিক এবং নান্দনিক রূপে ব্যবহার করেছেন আমাদের আহমেদ সফা, প্রবন্ধে এবং গদ্যে। সলিমুল্লাহ খান এমনিতেই তার ভুয়সি প্রশংসা করেন না। আমি এখন পর্যন্ত আহমেদ সফার একটা বাক্যেও ভুল ধরতে পারিনি। হুমাউন আহমেদ আনফরচুনেটলি ভাষায় কিছুই প্রসাদ আনতে পারেন নাই অথবা সে চেষ্টাও করেন নি। উনি গল্পকার, বঙ্কিম বা শরতের মত। আনিসুল যুগে এসে গদ্যের ভাষা হয়েছে অনেকটা আমি ভাত খাই টাইপের বাক্যের মত, অন্য লেখকরাও এখন গণহারে ভাষাকে প্রমিত করে চলছেন।
ভাষার প্রসাদগুণ বজায় থাকুক, কী পদ্যে, কী গদ্যে কী সামান্য ফেসবুক পোস্টেও। শহীদ দিবসে এটিই আমার চাওয়া।
ক্যালগেরি
২২ ফেব্রুয়ারি ,২০২৫ ইং

শুক্রবার, ফেব্রুয়ারি ০৭, ২০২৫

বই ও মাঠের গল্প

 কুশের বইমেলা সম্বন্ধে সবসময়ই আমার একটু দুর্বলতা ছিল। সেটা যে পুরোটা বইয়ের জন্য তা নয়, দোকানগুলো সৃজনশীল, দোকানিরা পরিচ্ছন্ন, ক্রেতারাও রুচিশীল। মেলার বাইরে পোড়া ভুট্টা, চটপটি (যদিও কোনসময়ই আমার পছন্দ নয়), কতকিছুর বিপণী। হুমাউন আহমেদ বিকাল থেকে বসতেন অন্যপ্রকাশের স্টলের সামনে। অটোগ্রাফ নেবার লম্বা লাইন পড়ত সামনে। হুমাউন আজাদ পুরোটা সময় বসে থাকতেন একটা স্টলে, নাম ভুলে গেছি, হাতে সিগারেট থাকত সব সময়। কোন এক সময় মেলার কোনদিকে হট্টগোল শোনা গেলে বোঝা যেত তসলিমা নাসরিনের উপর আত্রমণ হয়েছে কোথাও।

আমি নব্বই দশকের কথা বলছি। মেলার খুব কাছেই থাকতাম, বুয়েটের আহসানুল্লাহ হলে, মেলা যেতে রিক্সাভাড়া লাগত পাঁচ টাকা, চাইলে হেটেও যাওয়া যেত।
মেলার একটা জিনিস আমার ভাল লাগত, বিভিন্ন স্টলে বিশ্ববিদ্যলয়/কলেজ পড়ুয়া মেয়েরা একমাসের জন্য চাকরি পেত। পার্ট-টাইম চাকরি। আমাদের দেশে হতভাগা ছাত্র-ছাত্রীদের পার্ট-টাইম জব বলতে শুধুই টিউশনি বোঝায়। অথচ যেকোনো অফিস-আদালতে তাদের পার্ট-টাইম চাকরি হওয়ার কথা। বিদেশে তো তাই হয়। অফিসগুলো ছোট বাচ্চাদেরকেও কাজ করতে দেয়, বিশেষ করে সামারে। তা ছাড়া রেস্টুরেন্টেও কাজ করা যায়। আমাদের দেশে সেই কালচার আর হল না। কোন ছাত্র রেস্তোরাঁয় ক্যাশে বসলে সমাজ তাকে নিয়ে টিটকেরি করবে। এই বিষয়ে একটা ঘটনা মনে পড়ল। দিন তারিখ মনে নেই যদিও। প্রেসক্লাবের সামনে একটি রেস্টুরেন্ট, ভাত খেতেই মানুষ আসে বেশি। কোন এক দিন সেখানে গিয়ে দেখি, ক্যাশে বসে আছে আমারই এক স্কুল ফ্রেন্ড, নাম বলছি না যদি সে বিব্রত হয়। আমার সাথে সে সহজাত আচরণ করল। ছেলেটি ঢাকায় এসে স্ট্রাগল করছে। টিউশনি করাত কিনা জানি না, এই হোটেলে চাকরি করছে তা তো দেখতেই পাচ্ছি, পড়াশুনা এবং থাকাখাওয়ার যোগান দেয়ার জন্য। এটুকু বলতে পারি, বুয়েট থেকে বেড়িয়ে যখন চাকরি নিলাম, আমরা যে বেতন পেতাম তা বাজারে খারাপ ছিল না, তবে আমার সেই বন্ধুটি সেইসময় আমাদের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি বেতনে চাকরি করত। এইটাই মাঠের গল্প, বই থেকে পাওয়া নয়।
বই ও মাঠের গল্পে অনেক ফারাক থাকে। মাঠের ঘটনাগুলোকে বইয়ে স্থান দেয়া যায় না, দেয়া হয় না। অথবা দেয়ার ক্ষমতা লেখকদের নেই। আমাদের লেখকরা মধ্যবিত্তদের নিয়েই শুধু লিখতে পারে। উচ্চবিত্তেরের বৃত্তে তারা ঢুকতে পারে না, আবার নিম্নমধ্যবিত্তকে নিজেরাই ছোটলোক মনে করে। তাইতো মানিক বন্দোপাধ্যায়ের মত লেখা আমরা পাইনা। আমাদের লেখক/শিক্ষক/প্রবন্ধকার সবই চাটুকার বনে যায়। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আটহাজার বই লিখা হয়, অথচ তার বাড়ি ভাঙ্গার সময় একজনকেও প্রতিবাদ করতে দেখা যায় না মাঠে। ওই যে বললাম, মাঠ আর বইয়ের রাজ্যের পার্থক্যের কথা। মাঠে গল্প তৈরি হয়, সেই গল্প মিস করে ফেলে আমাদের লেখকরা। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কত গল্প লেখা হয়েছে? হাজার হাজার তো হবেই, এইসব লেখকের অধিকাংশ দেশে ছিল না সেইসময়, ছিল কোলকাতায়, যুদ্ধের পর ফিরে এসে আরাম কেদারায় বসে, গরম কফির মগ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের বীরত্বগাঁথা গল্প লিখেছে।
অথচ মাঠেই চরিত্র ঘোরাফেরা করে, আসল চরিত্র, যে লেখে সেও হয়তবা মাঠের একটা চরিত্র। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে রাশিয়ার যত যুগান্তকারী উপন্যাস লেখা হয়েছে তা লিখেছে যুদ্ধ করা সৈনিকরা। কিছুদিন আগে বদরুদ্দীন ওমরের লেখা 'আমার জীবন' বই পড়ছিলাম। কয়েকটি খণ্ডে। এক জায়গায় লেখা আছে, উনি যেহেতু কমিউনিস্ট পার্টি করতেন, গ্রামে যেতেন মাঝেমধ্যে, থাকতেন কৃষকদের বাড়িতে। একবার কোনো এক কৃষকের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন রাতে, কিশোরগঞ্জের কোথাও। তার সাথে একজন সহযাত্রী ছিল, আপনারা চিনবেন, মুরগি কবির। শাহরিয়ার কবির যে বালিশটা নিয়েছিলেন সেটায় ছিল কৃষকের ঘামের বোটকা গন্ধ। তার ঘুম আসছিল না। ধান্দায় ছিল বদরুদ্দিন ওমর সাহেবের বালিশটা যদি হাতিয়ে নিতে পারেন। একসময় প্রকৃতির ছোট চাপে বদরুদ্দিন ওমরা সাহেব বাইরে গেলেন। এই সুযোগে শাহরিয়ার কবির দ্রুত বালিশটি বদলিয়ে ফেললেন। ওমর সাহেব সেটা টের পেয়েছিলেন, কিন্তু ভদ্রতা করে বলেন নি, তবে সিদ্ধান্তে এসেছিলেন এই কবিরকে দিয়ে জাতির কিছুই হবে না।
উপরের গল্পটি বললাম কবিরকে ছোট করার জন্য নয়। বললাম আগেকার লেখকরা গ্রামে যেত, বদরুদ্দিন ওমরের বইয়ে এরকম আরও ঘটনা লেখা আছে। আমাদের আরেকজন লেখক আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, খোয়াবনামা লেখার সময় গ্রামে গিয়ে থেকেছেন। মানিক বন্দোপাধ্যায় পদ্মা নদীর মাঝি লেখার সময় জেলে বস্তিতে গিয়ে ছিলেন।
মাঠের গল্প লিখতে গেলে মাঠে যেতে হবে, অথবা হতে হবে মাঠের সন্তান। আমাদের মাঠের সন্তান তো কৃষক, তারা তো পড়তেই জানে না, সই বলতে টিপসই। জিয়ার আমলে এইসব মূর্খ লোকদের আলোকিত করার জন্য নৈশ ইস্কুল ছিল। আমাদের বাড়ির পাশেই রাতে এক হিন্দুবাড়ির উঠোনে স্কুল বসত। তারপর কবেই সেইসব চুকেবুকে গেছে। অশিক্ষিতরা আরো অশিক্ষিত হচ্ছে। কারা লিখবে বই?
যারা প্রবন্ধ লেখে তারা চেতনায় বলীয়ান হয়েই লেখে, চেতনাই তাদের একমাত্র সম্বল। যারা উপন্যাস লেখে, সেই আমি-তুমি-সে। হুমাউন আহমদে আমাদের শিখিয়ে গেছেন, ছোট কিশোরীরা কীভাবে বুড়োদের প্রেমে পড়বে। যে 'দেয়াল' নিয়ে আপনারা এত মাতামাতি করেন, সেই দেয়ালের দুটো মেইন চরিত্র অবন্তি- সেখানে পুরো শাওনের ছায়া দেখবেন, দাদা চরিত্র সরফরাজ খানের মধ্যে পুরো চ্যালেঞ্জারকে খুঁজে পাবেন। শেষ জীবনে হুমায়ূন যত লিখেছেন সবকিছুতেই শাওন ঘুরপাক খেয়েছে। লেখক হিসাবে এভাবেই তার অধঃপতন ঘটেছে। ভাল লেখক বলতে এখন নেই, হারিকেন দিয়েও খুঁজে পাওয়া যাবে না। তবুও বইমেলা চলবে, লোকে একুশে পদক পাবে। দেখা যাক একদিন যদি ভাল সময় আসে।
ক্যালগেরি
ফেব্রুয়ারি ৭, ২০২৫ ইং

সোমবার, ফেব্রুয়ারি ০৩, ২০২৫

ট্রাম্পের ট্যারিফ

 নাফটা চুক্তিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প কানাডা, মেক্সিকোর সাথে ট্রেড-ওয়ার শুরু করল। বিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে জমে ওঠা মুক্ত বাজার অর্থনীতির, যার জন্য প্রায় সব দেশেই প্রভুত উন্নতি সাধন হয়, অপমৃত্যু হল ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশে।

১৭৭৬ সালে এডাম স্মিথ মুক্তবাজার অর্থনীতির সূচনা প্রস্তাব করেন। তার মতে, দক্ষ এবং সাশ্রয়ী শ্রমিকরা তৈরি করবে পণ্য, তা তারা পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকুক না কেন। সেই পণ্য জটিল এক সাপ্লাই-চেইনের মাধ্যমে প্রতিটি দেশের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছবে। উপকৃত হবে প্রতিটি দেশ। মার্কেট ইকনোমির অর্থ হচ্ছে পণ্যের সাপ্লাই-ডিমান্ডে সরকারের নাক না গলানো এবং পণ্য যাতে ফ্রি-ফ্লো হয় তাতে সহায়তা করা। এর প্রথম শর্ত অযথা ট্যারিফ তুলে দেয়া।
বলশেভিক বিপ্লবের পরে কয়েক দশক ধরে পৃথিবীর বড় একটি অংশ মার্কসিও অর্থনীতির বাস্তব-প্রকাশ প্লানড ইকোনোমিক্স চর্চা করে, যেখানে রাষ্ট্র নির্ধারণ করবে দেশে কোন পণ্য কতটুকু উৎপাদিত হবে, সেটিও টেকশই হয়নি, বাহ্যত কমিউনিস্ট দেশগুলো মিশ্র ধনতান্ত্রিক দেশে পরিণত হয়েছে, কোনটি আবার অকাট্য শ্বৈরতান্ত্রিক দেশে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গেছে, দুই জার্মানি জোড়া লেগেছে। ভবিষ্যতে দুই-কোরিয়া যুক্ত হলেও আশ্চর্য হব না।
একবার সোভিয়েত ইউনিয়ন ফেরত এক ভাইকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ভাই, রাশিয়া দেশটি সম্পর্কে আমার অনেক কৌতুহল, বিশেষ করে তাদের রাস্তায় কোন ধরণের গাড়ি চলে, বাসায় কোন কোম্পানির ফ্রিজ, সেগুলো কি সোভিয়েতে তৈরি নাকি অন্য কোন দেশের? উত্তরে সেই ভাই বলেছিল, ওখানকার ফ্রিজগুলোর ওজন অনেক বেশি, জীবনেও নষ্ট হয়না, টেকে শতবছর। সেই উত্তর শুনে আমার মনে হয়েছিল, তাহলে ফ্রিজ কোম্পানিগুলো তো নতুন ফ্রিজ বানাতে পারবে না, কারণ কারও বাসার ফ্রিজ সহজে নষ্ট হচ্ছে না, তার মানে কোম্পানিগুলো উঠে যাবে, যার অর্থ হচ্ছে লোকে চাকরি হারাবে। বিষয়টি তুচ্ছ হলেও এর একটা গুঢ় অর্থ আছে। সমাজে টাকার প্রবাহ বহমান থাকা জরুরি, যেই দেশে মানুষ তার ইনকামের বড় একটা অংশ ব্যয় করবে পণ্য কেনায়, সেখানে ইন্ড্রাস্টি বিকশিত হবে লোকে চাকরি পাবে, এবং সর্বপরি মানুষ ভাল থাকবে। ভারতবর্ষে লোকে আগে সিন্দুকে টাকা জমাতো, ব্যংক ছিল না। ব্যাংক থাকলে যেটি সুবিধা, অন্য লোক আপনার জমাকৃত টাকা ধার নিয়ে ব্যবসা করতে পারবে এবং লোকে সেখানে চাকরি পাবে। অবশ্য কোনো দেশে সুফি দরবেশ বাবার মত দুষ্ট শক্তির আবির্ভাব হলে এবং ব্যাংকগুলো লুটে নিলে আম-ছালা দুটোই যাবে।
এবার বঙ্গবন্ধু প্রসঙ্গে আসি। না, ওনার সমালোচনা করছি না। ওনার লেখা বইগুলো আমি যথেষ্ট আগ্রহের সঙ্গে পড়েছি। প্রত্যেকটা বই দারুণ উপভোগ্য। তো 'আমার দেখা নয়াচিন' গ্রন্থে তিনি লিখেছেন- চিনে গিয়ে সেভ করার জন্য যে ব্লেডগুলো দেশ থেকে তিনি নিয়ে গিয়েছিলেন তা দ্রুত ফুরিয়ে যায়। উনি বাজারে গেলেন ব্লেড কেনার প্রত্যাশায়, সমস্ত দোকান খুঁজে কোথাও ব্লেড পেলেন না। শেষে এক দোকানে তিন-চার বছরের পুরোনো একটা জংধরা ব্লেড পেলেন। দোকানদার বলল, বিদেশ থেকে এইসব জিনিস আমরা আনি না। এমনিতেই আমাদের দাঁড়ি কম, যে দু'চারটে ছাগলি দাঁড়ি আছে তা আমরা নিজেদের দেশে তৈরি ক্ষুর দিয়েই শেভ করি। আমরা বিদেশকে কেন টাকা দিব? পাঠক লক্ষ্য করে দেখেন সেই দোকানদার এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কথার ধরণ সেম সেম। ট্রাম্প বলেছেন, কানাডা এবং মেক্সিকো তাদের তৈরি জিনিস বিক্রি করে আমাদেরকে এতদিন শোষণ করেছে, এখন এর একটা বিহিত করা দরকার। বঙ্গবন্ধুর ব্লেড কেনার অভিজ্ঞতার অনেক বড় একটা তাৎপর্য আছে- সেটি হলো দেশে ব্যবহৃত জিনিস দেশেই তৈরি হবে- শুধু তাই নয় সমাজতান্ত্রিক দেশের ধারা অনুযায়ী সেগুলো রাস্ট্রই তৈরি করবে। তাইতো দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে তিনি পাকিস্তানি ব্যবসায়ির ফেলে রাখা ৭২৫ টি কলকারখানার বড়গুলোকে রাস্ট্রায়াত্ব করে ফেললেন- এবং তারপর সেখানে আওয়ামীলীগের লোকদের যে মাৎস্যন্যায়- সেটি নিয়ে না'হয় আরেকদিন লিখব।
মোটকথা, দেশের জিনিস দেশেই তৈরি করব বলে যে একধরণের অবুঝ জাতীয়তাবাদের চেতনা - তা মুলত বাজে কথা। বরং অন্য দেশের জন্যও আমরা পণ্য তৈরি করব বললে বিষয়টি যথাযথ হয়। সাপ্লাই-ডিমান্ড যেমন ন্যাচারাল, বৈশ্বিক সাপ্লাই-চেইন তেমনি ন্যাচারাল- অর্থ্যাৎ মুক্ত বাজার অর্থনীতি। এটাই শেষ কথা হওয়া উচিত। যে চিন ঘুরে এসে বঙ্গবন্ধু আবেগাপ্লুত হয়েছিলেন তাদের সমাজতান্ত্রিকতা দেখে, যে চিনকে ধ্যানে- জ্ঞ্যানে-হৃদয়ে ধারণ করে মাওলানা ভাসানী বড় কিছু করতে চেয়েও পারলেন না, সেই চিন কিন্তু সত্তরের দশক থেকেই মুক্ত বাজার অর্থনীতিতে যাব যাব করছিল, এবং যখন গেল তখনই তরতর করে উন্নতির শিখরে অবতরণ করতে শুরু করল। ভারতের দিকে তাকান, এমনকি বাংলাদেশে, কোন দেশে নয় ? নব্বুই দশকের পর থেকে বাজার যখন উন্মুক্ত হল- দেশগুলো উন্নতি সাধন করতে থাকল।
যে ট্রাম্প এখন মুক্তবাজার অর্থনীতির কফিনে প্রথম পেরেক মারতে চাইছেন- তাদের একজন ফাউন্ডিং ফাদার- তাদের তৃতীয় প্রেসিডেন্ট থমাস জেফারসন - প্রেসিডেন্ট হওয়ার পরে খুব যত্ন করে একটি বই পড়েছিলেন- এডাম স্মিথের 'ওয়েলথ অফ নেশন'- বইটি মুক্তবাজার অর্থনীতির আকরগ্রন্থ। অথচ আজ দুশো বছর পরে এসে নিজের পণ্য নিজের দেশেই উৎপন্ন করব বলা ট্রাম্পের, ট্যারিফ ইমপোজ করার ট্রাম্পের, আসল উদ্দেশ্যখানা হয়ত আমরা এখন বুঝতে পারছি না, তবে শীঘ্র পারব।
ক্যালগেরি
৩/২/২০২৫ ইং
All reactions:
Md Mostaba Ali, Wahedul Islam Patowary Raju and 19 others
4 comments
1 share
Like
Comment
Send
Share

শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ০৬, ২০২৪

ছররা গুলি

 কটি বুলেটের পেটের ভেতর অনেকগুলি ছোট ছোট বুলেট, দশটা থেকে একশোটা হতে পারে। এরকম তিনটা গুলি পরপর ছোড়া হলে তিনিশো ছোট বুলেটে বিদ্ধ হতে পারে যেকেউ। হয়েছেও সেরকম ঘটনা। বগুড়ার শেরপুরের মজিদের গায়ে তিনশোটি গুলি লেগেছে। এই ধরণের ক্ষুদে গুলিকে ছররা গুলি বা পেলেট বলা হয়। বর্তমানের অস্থির পৃথিবীতে দিন দিন এর ব্যবহার বাড়ছে এবং সেখানে বাংলাদেশ অবশ্যই এক ধাপ আগিয়ে আছে (ছিল)। আমাদের পতিত দেশরত্ন শেখ হাসিনার অন্যতম প্রিয় অস্ত্র ছিল এই ছররা গুলি।

বিক্ষোভের দিনগুলোতে আপনারা অনেকের পিঠের দৃশ্য দেখে চমকে উঠেছেন। শুধু পিঠ নয় ওদের বুকও ছররা গুলিতে ঝাঁঝরা হয়। প্রথমে বুকেই এসে লাগে বুলেটগুলো, পরে পিছন ফিরে দৌড়ানোর সময় আরো বেশি পরিমাণ ছররা গুলি আঘাত করে পিঠে। মজিদ ছাড়াও অসংখ্য ভিকটিম রয়েছে। ১৮ জুলাই রামপুরায় জসিমের চোখে লাগে ছররা গুলি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মামুনের বুকে ছররাগুলি আঘাত হানে ১৫ জুলাই। সে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়েছিল। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অনন্য মজুমদার ছররা গুলিবিদ্ধ হয় ১১ই জুলাই। ১৬ই জুলাই নরসিংদীতে ছররা গুলিবিদ্ধ হয় কিশোর রিয়াদ। স্কুল ছাত্র সামীরের দুটো চোখে ছররা গুলির আঘাত লাগে ১৮ই জুলাই। ১৯ জুলাই নারায়ণগঞ্জের রাস্তা পার হতে গিয়ে ছররা গুলিবিদ্ধ হয় দর্জি মো. শামসুদ্দিন। ২০ জুলাই বাড়ি ফেরার পথে ছররা গুলির কপটে পড়ে গার্মেন্ট কর্মী জাহিদ। কতজনের নাম বলবো? এরকম শত শত ছাত্র-জনতা রয়েছে যাদের বুক-পিঠ-চোখ বিদ্ধ হয়েছে ছররা গুলিতে। এদের কেউ সরাসরি বিক্ষোভে অংশগ্রহণ করেছিল, কেউবা পথচারী, কেউবা এসেছিল ঠিক কি হয়েছে দেখতে। এদের কারো কারো পরিণতি হয় ভয়াবহ। দুটো বা একটি করে চোখ হারিয়েছে। বেশিরভাগের শরীর থেকে সবগুলো গুলি বের করা সম্ভব হয়নি। শরীরের তীব্র ব্যথা নিয়ে অনেককে বেঁচে থাকতে হবে বাকি জীবন। এরা গুলি খেয়ে যখন বিভিন্ন হাসপাতালের দ্বারস্থ হয় অনেকেই তাদেরকে অ্যাডমিট করতে চাইনি। ঘুরেফিরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যেতে হয়েছে। ছাত্রলীগের দুর্বৃত্তরা হাসপাতালেও হামলা করেছিল। আংশিক চিকিৎসা নিয়ে যারা ঘরে ফিরেছে রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারেনি। কখন পুলিশ এসে ধরে নিয়ে যাবে। সিভিল ড্রেস পরে কখন কোন বাহিনী চলে আসে বোঝা যায় না। কাউকে ডিবি অফিসে, কাউকে অজ্ঞাতনামা কোন স্থানে ধরে নিয়ে যায়। বুলেটবীদ্ধ হবার পরে সুচিকিৎসা তো দূরে থাক, জীবন বাঁচাতে পালিয়ে বেড়াতে হয়েছে যুবকদের, কিশোরদের। গুলিবিদ্ধদের সবারই একটি করে ব্যক্তিগত স্টোরি রয়েছে, বড় করুন সেই স্টোরি, মাঝে মাঝে চোখে পড়ে, চোখ আদ্র হয়।
সাধারণত এয়ারগান/শটগান ব্যবহার করে এই ছররাগুলি ছোড়া হয়। ইঁদুর কিংবা কীটপতঙ্গ মারার জন্য এই গুলির ব্যবহার রয়েছে। ঠিক কবে থেকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকাহিনীর হাতে এই টেকনোলজি উঠে এলো তা সঠিক বলতে পারব না। ছররাগুলির প্রকারভেদ রয়েছে, প্লাস্টিক বা মেটাল যেকোনো কিছু হতে পারে। সাধারণত দুই ধরনের ক্যালিবারের হতে পারে, ৪.৫ অথবা ৫.৫ মিলিমিটারের। হাসিনা নিশ্চয়ই ভালো মানের গুলি ব্যবহার করেছে। এমনিতে ছররা গুলি লিথাল উইপন হিসাবে পরিগণিত হয় না। রাবার বুলেট গোত্রের, তবে ক্ষতি একটু বেশি করে। এর পাওয়ার সত্যিকার বুলেটের চেয়ে অনেকাংশে কম। সেক্ষেত্রে মারা যাওয়ার চান্স কম তবে চোখ এবং গলায় লাগলে আংশিক দৃষ্টিশক্তি হারানো থেকে পুরোপুরি অন্ধ হয়ে যাওয়া সম্ভব। সেটিই হয়েছে গত জুলাই-আগস্টে বাংলাদেশে।
স্বৈরাচারী দেশগুলোতে সরকারবিরোধী আন্দোলন দমন করতে প্রাথমিক স্তরে ছররা গুলি ব্যবহার করা হয়। গণতন্ত্রের মুখোশধারী অথবা কাগজে-কলমে গণতন্ত্রের দেশগুলোতে এর ব্যাপক ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। বাংলাদেশ তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। আমাদের দেশে তো সব কিছুই গণতান্ত্রিক ছিল। পাঁচ বছর পর পর নির্বাচন হত। আমাদের একটি সংবিধান ছিল। একটি সংসদ ভবন ছিল। মানব-পতাকা বানিয়ে আমরা গিনিস বুকে নাম লিখিয়েছিলাম। গোলাভরা গণতন্ত্র আর গোয়াল ভরা উন্নয়ন ছিল। সেই সাথে ভারতের আশীর্বাদ। হয়তো ভারত থেকেই আমরা এই ছররা গুলির আইডিয়া আমদানি করে এনেছি কেননা ভারত কাশ্মীরে ২০১০ এবং ২০১৬ সালে এর ব্যাপক প্রয়োগ করে বহুজনকে অন্ধ বানিয়েছে। ভারত ছাড়াও ২০১৯-২০ সালে হংকংয়ে সরকারবিরোধী যে প্রটেস্ট হয় সেটা ছত্রভঙ্গ করতেও ছাররা গুলি ব্যবহার করা হয়। ভেনেজুয়েলাতে ২০১৪ থেকে ২০ পর্যন্ত ছড়াগুলির ব্যবহার পরিলক্ষিত হয়। ইসরাইল গাঁজা উপত্যকা, পশ্চিম-তীর এবং পূর্ব-জেরুজালেমে নিয়মিতভাবে ছররা গুলি ব্যবহার করে থাকে। উন্নত দেশ যথা ফ্রান্স কিংবা আমেরিকা, সেখানেও সাম্প্রতিক সময়ে এই গুলির ব্যবহার পরিলক্ষিত হয়। প্রত্যেক জায়গায় চোখ হারিয়েছেন অসংখ্য লোক।
আমি জানি না বাংলাদেশের বিদ্যমান আইনে অথবা পুলিশ কোডে ছররা গুলির ব্যবহার বৈধকরণ করা আছে কিনা। যদি থাকে সেখানে সংশোধন দরকার। যেহেতু এর বিকল্প আছে (জলকামান, রাবার বুলেট) সেহেতু এর ব্যবহার নিষিদ্ধ হওয়া উচিত। আর যদি এটি বাংলাদেশে বৈধ না হয় তবে পুলিশের হাতে কিভাবে এলো তার তদন্ত হওয়া উচিত। মোটকথা ভবিষ্যতের বাংলাদেশ আমরা আর শতগুলিবিদ্ধ কোন পিঠ দেখতে চাইনা। আমাদের খারাপ লাগে।
ক্যালগেরি, সেপ্টেম্বর ৬, ২০২৪

রবিবার, অক্টোবর ২৪, ২০২১

অক্টোবর স্কেচ

 (স্কেচ)

যদিও ভাল পারিনা , আঁকার চেষ্ট করি। আমার ছবিতে কোন রং নেই, তুলি নেই, স্রেফ একটা কলম হাতে। এই দিয়েই চেষ্টা করি। 








পাহাড়ি ঝরনা-৩

(ভ্রমণ)

আমাদের গাড়ির তেল শেষ হয়ে যাচ্ছিল। বানফ্ শহরের আগে একটা তেলের পাম্প পেয়েও অবহেলা করেছি। ভেবেছিলাম হাইওয়ের পাশে পরে অবশ্যই তেলের পাম্প পাবো। বানফ্ শহর পার হয়ে যাবার পরে আমরা যখন ডানে ঘুরে হাইওয়ে-১ থেকে সরে জেসপারের হাইওয়ে ধরলাম তখন থেকেই ঘন অরণ্য শুরু হয়ে হলো। একটু পরে ফোনের নেটওয়ার্ক চলে গেল। আমি একই সাথে খুশি হলাম এবং ভয় পেলাম। খুশি হলাম এইজন্য যে কেউ ফোনে বিরক্ত করবে না, আর ভয় পেলাম যদি গাড়ির তেল হঠাৎ করে শেষ হয়ে যায় তাহলে ফোন করে কারও সাহায্য চাইতে পাবো না। আমার সিএএ এর মেম্বারশিপ করা আছে, এইজন্য বছরে ১০০ ডলারের মতো গুনতে হয়। ওদের সাথে চুক্তি আছে রাস্তায় যেকোনো ধরনের বিপদ হলে ওরা এসে উদ্ধার করবে। শর্ত হলো বছরে তিনবারের বেশি ডাকতে পারবো না। তিনবারের বেশি হলেও সাহায্য করবে, তবে গলা কাটবে। কাজেই আমাকে হিসেব করে চলতে হয় যাতে বছরে তিনবারের বেশি বিপদে না পড়ি। চলতি পথে যেকোন বিপদ হলে এদের সাহায্য করার কথা। বরফে গাড়ি আটকে গেলে আগে কয়েকবার এদের সাহায্য নিয়েছি, সার্ভিস ভালো, ঘণ্টাখানেকের মধ্যে উদ্ধার করে দিয়ে যায়।
কখনো ভাবিনি কানাডার কোনো হাইওয়েতে ফোনের নেটওয়ার্কে টানাটুনি পড়বে। ফোনে গুগল ম্যাপ সেট করা ছিল। নেটওয়ার্ক না থাকার ফলেও কীভাবে যেন এটি কাজ চালিয়ে যাচ্ছে, ম্যাপ নামের অ্যাপটি ওভারস্মার্ট হয়েছে কিনা কে জানে? তবে থোরা গড়বড় হয়েছেই, মাঝেমাঝেই ইউ-টার্ন নিয়ে ভাটির দিকে চলে যেতে বলছে। ফোনে নেটওয়ার্ক নেই জেনেও নিয়ারেস্ট গ্যাস স্টেশন বলে সার্চ দিলাম। ম্যাপ উত্তরে বলল চারশো কিলোমিটার পরে ব্রিটিশ কলম্বিয়ার ছোট্ট এক শহরে একটি গ্যাস স্টেশন পাওয়া যাচ্ছে। বউকে বললাম তুমি বরং রাস্তার আশেপাশের সাইন গুলা লক্ষ্য করো, সামনে সার্ভিস-টাউন থাকলে সাধারণত সাইনবোর্ড দিয়ে আগেভাগেই জানিয়ে দেয়া হয়।
হাইওয়ে গিলতে গিলতে আমার গাড়ি এগিয়ে চলছে। কোনো ছোট শহরের হদিস খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আগে চেপে ভাবিনি এটাতো পাহাড়, এখানে হঠাৎ করে সার্ভিস শহর কোত্থেকে আসবে?
গাড়ির যেমন তেলের তেষ্টা পেয়েছে, আমার পেয়েছে কফির তেষ্টা। আমি যখন হাইওয়ে দিয়ে গাড়ি ড্রাইভ করি সবসময় এক হাতে স্টিয়ারিং ধরে থাকি। আরেক হাতে ধরা থাকে কফির কাপ। কফি নেই তাই দুই হাতে স্টিয়ারিং হুইল ধরে আছি। দুই হাত দিয়ে চালাতে বড় কষ্ট হচ্ছে। গাড়ি মাঝে মাঝেই ডানে বামে টাল খেতে চাচ্ছে।
আগেই বলেছি রাস্তার দুধারে গভীর সবুজ অরণ্য। সেখানে কোন প্রাণীর অস্তিত্ব নেই, একেবারে বিরান। হরিণ ভাল্লুক দূরে থাক, একটা পাখি বা ফরিঙও দেখতে পেলাম না। এরা সম্ভবত মানব সভ্যতার সাথে গোসা করেছে। যেহেতু অরণ্য, অবশ্যই লাখে লাখে প্রাণী আছে, রাগ করে মানুষকে মুখ দেখাতে চাচ্ছে না এই যা। গাছরা যেহেতু নড়তে পারে না, বাধ্যহয়ে সুবোধ বালকের মতো দাঁড়িয়ে আছে রাস্তার দুই ধারে। ক্ষমতা থাকলে এরাও মানুষের কাছ থেকে দূরে পালিয়ে যেতো।
এখানে কিছুদুর পরপর রাস্তার নিচ দিয়ে পশু পারাপারের টানেল রয়েছে। বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে দেখেছে গাড়ির নিচে পিষে যাবার ভয়ে বন্য প্রাণিকূল রাস্তার একপাশের জঙ্গল থেকে আরেক পাশের জঙ্গলে যেতে চাইছে না। মেটিং সিজনে দেখা গেল নারী প্রাণীরা রাস্তার একধারে, পুরুষ প্রাণীরা রাস্তার আরেক ধারে বসে বসে দীর্ঘশ্বাস ফেলছে। বিজ্ঞানীরা অংক কষে দেখলেন, এদের যদি ওই বিশেষ কাজটি করতে না দেয়া হয় তাহলে অদূর ভবিষ্যতে এরা বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। অতএব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হলো রাস্তার নিচ দিয়ে টানেল তৈরি করা হবে শুধুমাত্র পশু পারাপারের জন্য। লাখ লাখ ডলার খরচ করে অনেক টানেল তৈরি করা হলো। প্রথম যে টানেলটি তৈরি করা হয়েছিল, উদ্ভোধনের দিন থেকেই খাতা-কলম নিয়ে বসা হলো প্রতিদিন কত হাজার প্রাণী পারাপার করে সেটা দেখার জন্য। বাস্তবে দেখা গেল ভুলেও কোন প্রাণী টানেলের কাছাকাছি আসছে না। যদিওবা কেউ আসছে তাদের চোখে সন্দেহের দোলা। ভাবছে টানেল এর মধ্যে না জানি কী মৃত্যুকূপ বানিয়ে রেখেছে মরার মানুষেরা। একটি প্রাণীও টানেলের ভিতর মাথা ঢুকায় নি। এভাবে এক বছর গড়িয়ে যায়, অবশেষে এক গভীর রাতে একটি ভাল্লুক অনেক দোনোমোনো করে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে টানেল পার হয়। আমার ধারণা তার যে এই সৎসাহস হয়েছিল সেটা সেই বিশেষ কাজটি করার তারণা থেকে। হয়তো তার বান্ধবী রাস্তার আরেকদিকে থাকতো। এরপর আর ফিরে তাকাতে হয়নি। বানের জলের মতো পশুরা টানেল পারাপার করেছে আর বলেছে এক বছর ধরে কী ভুলটাই না করেছি।
আগেভাগে কোন সাইন না দিয়েই হঠাৎ করে যেন মাটি ফুঁড়ে একটা গ্যাস স্টেশন মাথা চাড়া দিয়ে উঠল। গ্যাসস্টেশন পার করে আমি কিছুটা উজিয়ে গিয়েছিলাম, পরে ফেরত এসে প্রাণভরে গ্যাস নিলাম। একটু আগে জঙ্গলের মধ্যে প্রকৃতির ডাক সেরেছি ভেবে লজ্জা পেলাম।এখানে কতো ভালো রেস্টুরেন্ট ছিল।

পাহাড়ি ঝর্ণা - ২

(ভ্রমণ)

বিশ বছর আগে রাজু নামের এক ছেলের সাথে পরিচয় হয়েছিল। ছেলেটি ছিল গ্যাংটকের একটি হোটেলের এসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার। আসামের ছেলে। আসামের এক-তৃতীয়ংশ মানুষ বাংলা বলে, রাজু তারমধ্যে পড়েছে। কাজেই আলাপ-পরিচয় হয়ে উঠল। রাত দশটার পরে সব ট্যুরিস্ট বিছানায় কুপোকাৎ। রাজু তখন আমার রুমে আসতো গল্প করতে। জানতে পারলাম ছেলেটি ছোটবেলায় আসামের জঙ্গল থেকে গ্রেট হিমালয়ের দিকে ধ্যানমগ্নের মতো তাকিয়ে থাকতো, ভাবতো একদিন ওখানে চলে যাবে। পাহাড় ওকে টানতো। আমি রাজুর সাথে আমার মিল খুঁজে পেলাম। শরৎকাল আমাদের বাড়ি থেকে হিমালয় দেখা যেত, স্পষ্ট নয়, তবে ইগনোরও করা যেত না । রাজুর মতো আমিও পাহাড় দেখে উদাসী হতাম। তবে ওর মতো পাহাড়ের কাছে গিয়ে সারাজীবনের জন্য আত্মসমর্পণ করার ইচ্ছা কখনো জাগেনি। ঠিক করে রেখেছিলাম হাতে পয়সা এলে হিমালয়ে যাবো। সেটা গিয়েছি।
হিমালয় দেখেছি, আল্পস দেখেছি, রকি দেখেছি। এছাড়া খুচরা কত যে পাহাড় দেখেছি। পাহাড়কে নিয়ে আমার আদিখ্যেতা এখনও বহাল আছে। পাহাড়ের গায়ে জড়িয়ে থাকে ঘন অরণ্য। আরণ্যকে মেলারকম শব্দের উৎপত্তি হয়। কখনো পাহাড়ি ঝিঁঝিঁপোকা, কখনও ভল্লুকের শুকনো পাতা মাড়ানো, কখনও বয়ে চলা ঝর্ণার শব্দ, এবং অবশ্যই পাহাড়ি নদীর শব্দ। পাহাড়ের অন্তর্গত সৌন্দর্য পরিপূর্ণ করার জন্য একটা নদীর উপস্থিতি জরুরী হয়ে পড়ে। সেরকম একটা নদী আমাদের সাথে বেশ কিছুক্ষণ থেকেই লুকোচুরি খেলছে। কখনও হাইওয়ের একেবারে কাছে এসে পড়ে, কখনও অরণ্যকে সামনে ঠেলে দিয়ে কোথায় যেন কেটে পড়ে।
একবার কফি-ব্রেকে সালাহউদ্দিন ভাই রেগে গেলেন। বললেন পাশে এত সুন্দর একটা নদী বয়ে চলছে আর তুমি একবারও থামলে না? আমি বললাম সামনে নিশ্চয়ই থামার জায়গা পাবো।
আমরা গাড়ি চালাচ্ছি,নদী আমাদের সাথেই আছে। নদীটি টাটকা,মনে হবে এখনি ওভেন থেকে নামানো হয়েছে। ওর পানির রং ডাবের পানির মতো ঘোলাটে-সাদা।
আমার স্ত্রী একসময় বলল যদি নদীর পানি স্পর্শ করতে পারতো। এইবার আমি সিরিয়াস হলাম। বৌয়ের এই আবদার আমার একদম সামর্থ্যের মধ্যে।

পাহাড়ি ঝর্ণা -১

(ভ্রমণ)

রকি পাহাড়ে অনেক দৃষ্টিনন্দন লেক আছে। কিছু লেক বিখ্যাত, সবাই দেখতে যায়, কিছু অখ্যাত। ছবির এই লেকটি অখ্যাত, কালেভদ্রে কেউ এখানে বেড়াতে আসে। জায়গাটি অমানবিক রকম নির্জন। এর একটা ভৌতিক কারণ আছে বলে আমি মনে করি। কেন এমন মনে করছি সেটা পোস্টের শেষে থাকবে।
নির্জনতার জন্য সদ্য বিবাহিত স্বামী-স্ত্রী এই লেকটাকে পছন্দ করে। তাই এর নাম হানিমুন লেক। আশেপাশে হোটেল বা কটেজ কিছুই নেই। এখানে যারা কয়েকদিনের জন্য আসে তারা সঙ্গে তাবু বা ক্যাম্পার নিয়ে আসে।
নিচের ছবিটি ২০০৯ সালে তোলা, বৌসহ এসেছিলাম। তখন আমাদের বিয়ের বয়স পাঁচ , তাই হানিমুন কোটায় পড়ি নাই। এরকম চমৎকার একটি জায়গায় দুজনে একসাথে একটি ছবিও তুলতে পারিনি। কারণ হচ্ছে - তখন সেলফি ক্যামেরা ছিল না। এই ছবিটি সনি সাইবারশট নামে এক ক্যামেরা দিয়ে তোলা। বৌ আমার ছবি তুলে দিয়েছে, আমিও তারটা তুলেছি ,ভাইস-ভারসা। আশেপাশে লোকজন থাকলে তাদেরকে রিকোয়েস্ট করতাম, কিন্তু কেউ ছিল না, যে একজন ছিল সে নিশ্চয়ই আমাদের মতো রক্ত মাংসের কেউ নয়। ভুতের বিষয়টায় পরে আসছি। স্টে-টিউনড।
২০০৯ সালে আমাদের সন্তান ছিলনা। এখন দুজন রাজকন্যা আছে। উপরের ছবিটিতে তাদেরকে দেখছেন। এই ছবিটি কয়েকদিন আগের তোলা।
দুটো ছবিতে কোন পার্থক্য দেখছেন? উপরে তাকিয়ে দেখুন, আগের ছবিতে পাহাড়ের চূড়ায় বরফ ছিল, একযুগের ব্যবধানে সেই বরফ হাপিস হয়ে গেছে। একেই বলে গ্লোবাল ওয়ার্মিং। বিষয়টা কত দ্রুত ঘটে যাচ্ছে মশাই ভাবতে পারেন?এখনো সময় আছে গাছটাছ লাগান, কম করে তেল পোড়ান। ইউরোপকে দেখে শিক্ষা নিন। ওরা যেভাবে সবুজ হচ্ছে সেটা হিংসে করার মতো।
এবার ভৌতিক ব্যাপারটায় আসি। আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে আছি তার সামনেই একটি ঘাট আছে। সেখানে একটা খেয়া নৌকা বাঁধা থাকে। কাঠের লগ দিয়ে একটা লম্বা ডেক করা হয়েছে। সেই ডেকের মাথায় ২০০৯ সালে একটি নারীকে বসে থাকতে দেখেছিলাম। একেবারে অনড়, মনে হচ্ছিল যেন মূর্তি। সোনালি চুলের এক তরুণী। মেয়েটির সাথে কোন ছেলেবন্ধু ছিল না। সে ছিল একদম একা। বাড়ি থেকে গণ্ডগোল করে এসেছে কিনা কে জানে? যদি পানিতে ঝাপ দেয়?সেইবার মেয়েটির খুব কাছে গিয়ে গলা খাকারি দিয়েছিলাম তার মনোযোগ আকর্ষণ করার জন্য, যদি একটা ছবি তুলে দেয়। কিন্তু সেই নারী পিছন ফিরে তাকায়নি। একটুও নড়েনি। আমার কেমন যেন একটু গা শিওরে উঠেছিল। কী কারণে জানিনা।
এইবার বারো বছর পরে হাইওয়ে দিয়ে যাবার সময় গাছের পাতার আড়ালে ছোট একটা সাইন দেখলাম- হানিমুন লেক। একটা সরু পাহাড়ি রাস্তা জঙ্গলের মধ্যে হাড়িয়ে গেছে। আমি সাইনটি পার হয়ে গিয়ে কী মনে করে গাড়ি থামালাম। সালাহউদ্দিন ভাই আমাকে ফলো করছিলেন। উনিও ঘ্যাচ করে ব্রেক কষলেন। আমি ইউটার্ন নিয়ে সেই সরু রাস্তায় ঢুকে পড়লাম। আগেকার অনেক স্মৃতি মনে পড়ল। আমার স্ত্রী বলল, কী আশ্চর্য ব্যাপার সেই হানিমুন লেক?
সেইবার সন্ধ্যা ছিল। আজকেও তাই, চারপাশে টোয়াইলাইটের আলো। আমি গাড়ি থেকে নেমেই থমকে দাঁড়ালাম। একই যায়গায় একই ভঙ্গিমায় সেই নারীমূর্তি। সোনালি চুলের তরুণী। সালাহউদ্দিন ভাইকে বিষয়টা বলায় উনি বললেন, বিষয়টা তো ভৌতিক। চলো আমরা আর ওদিকে না যাই, কী দরকার ?
আমি আধিভৌতিক কিছুই বিশ্বাস করি না। তবুও আমার মনটা খচখচ করে উঠলো।

সোমবার, সেপ্টেম্বর ২৪, ২০১৮

প্রেইরির দিনরাত্রি - ওগেমা


নি রবিবার আমরা বেরিয়ে পড়ি। কোন নির্দিষ্ট গন্তব্য থাকতে হবে এমন কোন কথা নেই। হয়তো হাইওয়ে থেকে অজানা কোন গ্রাভোল রোড ধরে এগিয়ে চললাম। পথের পাশে ক্যানলা অথবা সূর্যমুখী ফুলের ক্ষেত দেখে গাড়ি পুলওভার করি ,ফুল ছিড়ি, প্রজাপতির নাচানাচি দেখি। মেঠো পথের এক পাশ থেকে আরেক পাশে কোন ইঁদুর দৌড় দিয়ে পার হবার সময় একটি পুরো পরিবারকে সেলফি তুলতে দেখে থমকে যায়, বোঝার চেষ্টা করে এই ঝোপ-জঙ্গলে এত দেখাদেখির কী আছে?



প্রেইরিতে বড় গাছ থাকার কথা নয়, তারপরেও আমাদের এদিকে ছোটখাটো বন আছে, সেখানকার গাছগুলো এত সরু যে, দুহাত দিয়ে তাদের কোমড় জড়িয়ে ধরা যায়। এইসব বনে হরিণ এবং অন্যান্য প্রাণিদের আস্তানা। রাস্তার পাশে এরকম ফরেস্ট পড়লে ইঞ্জিন বন্ধ করে চুপচাপ অপেক্ষা করি হরিণ দর্শনের লোভে।
আজকে অবশ্য উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘোরাফেরা নয়। আজকের ভ্রমণ তিন মাস আগে থেকেই প্লান করা। আমাদের বাড়ি থেকে দুইশো কিলোমিটার পশ্চিমে ওগেমা নামের এক ছোট শহর আছে। আর দশটা ছোট শহরের মতই এর চেহারা, মেইন রোড নামের একমাত্র রোড, সেই রোডে একটি ডাকঘর,একটি পুরোনো রেস্তোরা এবং একটি পানির ট্যাং এইসবই থাকার কথা। কিন্ত এই শহরটা একটু আলাদা, এখানে একটি রেলস্টেশন আছে, সামারে প্রতি উইকএণ্ডে ট্যুরিস্টদের নিয়ে একটি হেরিটেজ ট্রেন ছাড়ে, সাউদার্ন প্রেইরি রেলওয়ে নামের এক কোম্পানি এই ট্রেনের মালিক।
১৮৮২ থেকে ১৯৩১ সাল পর্যন্ত অন্যান্য জায়গার মত প্রেইরিতেও ব্যাপকভাবে রেলের কার্যক্রম চলে। প্রত্যেকটি কমিউনিটির পাশে রেলস্টেশন তৈরি করা হয়। বড় শহরগুলোতে সেইসব রেলস্টেশনের কোন চিহ্ণ আজ আর অবশিষ্ট নেই কিন্ত ছোট শহরগুলোয় এখনো রেলস্টেশনের ধ্বংসাবশেষ রয়েছে। এইসব ছোট শহরে স্টেশন রোড নামের একটি সড়ক এখনো আছে।
প্যাসেঞ্জার ট্রেনের পাশাপাশি শস্য পরিবহনের জন্য ছিল মালগাড়ি ।কৃষকরা ঘোড়ার গাড়িতে গমের বস্তা বোঝাই করে স্টেশনে আসত, মালগাড়িতে সেইসব বস্তা লোড দেয়া হত। এখানকার জমিতে এত এত ফসল ফলে যে বস্তায় ফসল ভরে রাখা এফিসিয়েন্ট নয়, প্রয়োজন বড় আকারের স্টোরেজ। কাজেই গ্রেইন-এলিভেটর নামের এক ধরণের সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। গ্রেইন-এলিভেটর আসলে এক মাল্টি-পারপাস কমপ্লেক্স। এর কথা পরে বিশদভাবে বলবো। পুরো প্রেইরি জুরে এইসব এলিভেটর তৈরি করা হয়েছিল।এরা কালের সাক্ষী হিসেবে এখনো দাঁড়িয়ে আছে। প্রেইরির ল্যান্ডস্কেপে দুই ধরনের স্থাপত্যই দেখা যায়, এইসব এলিভেটর এবং ওল্ড ফ্যাশনড বার্নহাউস। আজকে ট্রেনে চেপে আমাদেরকে এরকম একটা এলিভেটর দেখাতে নিয়ে যাবে।
তিনমাস আগে অনলাইনে টিকিট কাটতে গিয়ে দেখি এই ট্রেন ভ্রমণের অনেকগুলো ভার্সন রয়েছে। যেমন একটি ডিলের নাম ট্রেন-ডাকাতি। চলন্ত ট্রেনে যাত্রীর বেশে লুকিয়ে থাকা কোন ডাকাত হঠাৎ করে চেন টেনে দিবে। তারপর ঝোপের পিছনে লুকিয়ে থাকা অন্যান্য ডাকাত হুড়মুড় করে ট্রেনে উঠে পড়বে যাত্রীদের মালামাল লুট করার জন্য।
আরেকটি ডিল রয়েছে ছোট বাচ্চাদের জন্য। অনবোর্ড বাচ্চাদেরকে নানা ধরণের এক্টিভিটিজ করানো হবে, যেমন তাদের হাতে পায়ে টাট্টু এঁকে দেয়া, ছবিতে কালার করানো ইত্যাদি।
অ্যালকোহলিকদের জন্য একটি ডিল রাখা হয়েছে। ট্রেনে পর্যাপ্ত পরিমাণে মদ রাখা হবে, যাত্রীরা ইচ্ছামত পান করবে। জঙ্গলের মধ্যে ট্রেন থামিয়ে একটা গম্বুজের মধ্যে ডিনার করানো হবে এইসব মদপ্রেমিকদের।
আমরা ট্রেন ডাকাতির টিকেট কাটতে চাইলাম, কারণ ব্যাপারটায় রোমাঞ্চ আছে। কিন্তু ডাকাতির ট্রেন পুরো সিজনের জন্য সোল্ড-আউট হয়ে গিয়েছে। বাচ্চাদের টাট্টুওয়ালা ট্রেনেরও একই অবস্থা। কাজেই রেগুলার একটি ডিল নিতে হয়েছিল।
তিনমাস পার হয়ে আজকে ওগেমা যাবার দিন পড়েছে। কিন্তু আকাশ সহায় নয়, সকালে দুই পশলা বৃষ্টি হয়েছে, আকাশে আরো কিছু মেঘ রেডি হয়ে বসে আছে, আমরা রাস্তায় নামলেই ফটাস ফটাস করে ফাটবে।
আমাদের বাসা থেকে ওয়েবার্ন হয়ে ওগেমা যেতে হবে। কোন হাইওয়ে বদলের ব্যাপার নেই, আমাদের বাড়ির পাশ দিয়ে যে হাইওয়ে-১৩ বয়ে গেছে সেটাই আমাদেরকে ওগেমা পর্যন্ত নিয়ে যাবে। ওয়েবার্ন দশহাজার লোকের শহর। বড় গ্রোসারি স্টোর রয়েছে। আমার বৌ প্রস্তাব করল, ওদিক দিয়েই যখন যাচ্ছি, তখন মাসের বাজারটা সেড়ে ফেলা উচিত হবে। আমি বললাম, আজকে রোববার, ফিরে আসার সময় পাঁচটা পার হয়ে যাবে, দোকান খোলা থাকবে না।
ওগেমার ট্রেন দেড়টার সময়। বৌ বলল, তাহলে আগেই ওয়েবার্নে বাজার করে যাই।
তথাস্তু, আমি বৌকে বললাম।
ওয়েবার্নে বাজার করতে একঘন্টার বেশি সময় কেটে গেল। তারপর আমাদের সবার খিদে পেল। বাচ্চারা খিদে সহ্য করতে পারবে না, একটা টিম হর্টনে ঢুকলাম তাড়াতাড়ি কিছু মুখে দিতে। কিন্ত মেয়েরা যে গতিতে খাচ্ছে হিসাব করে দেখলাম ট্রেন ফেল হবে। মেয়েরা কতদিন থেকে প্রস্তুতি নিয়ে আছে ট্রেনে চাপবে, এখন ট্রেন ফেল করলে তাদেরকে কী বলে সান্তনা দেব?
বৌকে বললাম, খাওয়া বন্ধ করতে হয়, এখনি রওয়ানা না দিলে ট্রেন ধরা যাবে না।
কিছু হবে না, বৌ উত্তর দিল।
আমি বললাম, এদেশের মানুষ এমনিতে ভালো, এরা হাসিমুখে কথা বলবে, কুশল আদান প্রদান করবে, আমরা ট্রেন মিস করলে দুঃখপ্রকাশ করবে, কিন্তু আমাদের জন্য এক মিনিটও অপেক্ষা করবে না, ট্রেন ঠিকই ছেড়ে দিবে।
কাজেই বাদবাকি খাবার প্যাকেট করে নেয়া হল। গাড়িতে বসে খাওয়া যাবে।
হাইওয়ে ১৩ দিয়ে ১২০ কিলোমিটার বেগে ছুটে চললাম। একশোর রাস্তা, অনেকে একশো বিশে চালায়, আমি সর্বোচ্চ একশো দশে চালাতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। এর বেশি স্পিডে চালালে মনে হয় গাড়ি কাঁপছে। আজকেই ব্যতিক্রম। স্পিডিং টিকিট জুটতে পারে ভাগ্যে, কিছুই করার নেই।
ওগেমা স্টেশনে পৌঁছে দেখি হাতে পাঁচ মিনিট সময় আছে, ট্রেনের ইঞ্জিন স্টার্ট দেয়া হয়ে গেছে।
আমি বৌকে বললাম, তুমি দৌঁড়ে গিয়ে ট্রেন থামাও, আমি মেয়েদেরকে নামাচ্ছি।
টিকিট কাউন্টারের লোকজন আমাদের জন্যই অপেক্ষা করছিল। আমার স্ত্রী জানালার কাছে যেতেই তারা বলল, তোমার লাস্ট নেম কী তারেক? বৌ বলল, না , আমার হাজবেন্ডের লাস্ট নেম তারেক। ও বাচ্চাদের গাড়ি থেকে নামাচ্ছে।
ওই হল, বলে কাউন্টারের মহিলাটি আমার বৌকে চারটি টিকিট ধরিয়ে দিল।
টিকিট না দিলেও পারতো, কেননা আমাদের কাছে অনলাইন অর্ডারের কপি রয়েছে। টিকিট দেয়ার কারণ টিকিটের একটা অংশ এখানকার এক জাদুঘরে যাবার কমপ্লিমেন্টারি টিকিট, জাদুঘরটি নাকি অবশ্য দ্রষ্টব্য। পরে এর কথা বলব, সেখানে একজন ইন্টারেস্টিং মানুষের সাথে পরিচয় হয়েছে, নাম আরচি।
আমরা ট্রেনে চাপার সাথে সাথেই ট্রেন ছেড়ে দিল। আমাদের গন্তব্য হরাইজন নামক এক গ্রাম, সেখানেই রয়েছে গ্রেইন-এলিভেটর যার কথা আগে বলেছি।
ট্রেনের গার্ড ভদ্রলোকটি পরিপাটি করে ইউনিফর্ম পরেছে, তাকে টাইটানিক জাহাজের ক্যাপ্টেনের মত লাগছে। মাথায় যে হ্যাট পরেছে সেটা শুধুমাত্র রেলের গার্ড, সিপের ক্যাপ্টেন এবং উড়োজাহাজের পাইলটরাই পরে। একমাত্র ব্যতিক্রম নৌ বাহিনীর লোকেরা, তারা শুকনো জায়গায় বসে থাকলেও এই হ্যাট পরিধান করে।
ট্রেনে আরও একজন কর্মচারী রয়েছে, ইনি মহিলা, এঁর বয়সও ভালই হবে, ষাটের উপরে তো হবেই। বোঝা যাচ্ছে এরা সবাই ভলান্টারিলি সার্ভিস দিচ্ছে। মহিলাটির হাতে একটি মাইক, সে আমাদেরকে অত্র অঞ্চলের ইতিহাস বর্ণনা করবে।
গাড়িতে একটিমাত্র বগি। গাড়ির ইঞ্জিন ১৯৫০ সালের তৈরি। বগিটি ১৯২০ এর দশকের। ইচ্ছা করেই হয়তো সংস্কার করা হয়নি। ১৯২০ সালের একটা আবহাওয়া পাওয়া গেল।
ছোটবেলায় যেরকম ট্রেন দেখেছিলাম এই ট্রেনের জানালাগুলো সেরকমই। জানালা তুলে দিলে সড়াৎ করে নেমে যাচ্ছে। গার্ড বলল, সাবধান, জানালার কাঁচ দিয়ে হাত কেটে যেতে পারে। জানালা খোলার চেষ্টা না করাই ভাল।
ট্রেনে হিটিং নেই, মাথার ওপরে কয়েকটি ফ্যান ঘুরছে। বাইরে ১১ ডিগ্রী সে: তাপমাত্রা, এখন ফ্যানের দরকার নেই। গার্ড সাহেবকে বললাম, আমাদের মাথার উপরের ফ্যানটা বন্ধ করতে। সে বলল, ফ্যান অফ করার বন্দোবস্ত নেই। ইঞ্জিনের সাথে ডাইরেক্ট লাইন করা, ইঞ্জিন বন্ধ করলেই ফ্যান বন্ধ হবে।
এই কোম্পানি গত ছয়বছর ধরে ট্রেন সার্ভিস চালু করেছে। মহিলাটি বলল, তাদের অত টাকাপয়সা নেই, তাই পেপারে বা টিভিতে বিজ্ঞাপন দিতে পারে না। ফ্রিতে একটা ফেসবুক পেজ খুলেছে, সেখানে দশ হাজার ফলোয়ার আছে। সেই পেজের মাধ্যমেই যতটা সম্ভব এডভার্টাইজমেন্ট করা হয়। আমাকে জিজ্ঞেস করল আমি কার কাছ থেকে তাদের কথা শুনেছি।
আমি বললাম এক বন্ধুর কাছ থেকে।
বুড়ি বলল, সেই বন্ধু কার কাছ থেকে শুনেছে?
আমি বললাম, সে গতবছর এই ট্রেনে চেপেছিল। সেও কোন এক বন্ধুর কাছে শুনে ট্রেনে চেপেছে। কাজেই দেখা যাচ্ছে ওয়ার্ড অফ মাউথের মাধ্যমেই তোমাদের ভাল এড হচ্ছে। ফেসবুকের পেজ খুলে মনে হয়না কোন লাভ হয়েছে। দশ হাজার ফলোয়ারের কথা বলছ? ফেসবুকের ফলোয়ারের কাজ শুধু ফলো করা পর্যন্ত, তার বাইরে কিছুই নয়।
ভেবেছিলাম ট্রেনে অনেক বাচ্চা কাচ্চা দেখতে পাবো, কিন্তু আমরা এবং আরেকটি পরিবার ছাড়া কারও বাচ্চা নেই। অধিকাংশ লোক সদ্য রিটায়ার্ড করা, স্বামী-স্ত্রী জোড়া বেঁধে এসেছে। এই দেশের লোকেরা রিটায়ার্ড করার পরে আসল ফান শুরু করে। দর্শনীয় জায়গাগুলো ঘুরে ফিরে দেখে। অনেকে পৃথিবী ভ্রমনে বেরিয়ে পড়ে। বছর দশ-বারো ফান করার পরে এরা সিনিয়র সিটিজেনের খাতায় নাম লেখায়। তখন তাদের কাজ হয় বাড়ি থেকে গাড়ি চালিয়ে নিকটস্থ কফির দোকানে গিয়ে আড্ডা দেয়া। আড্ডা দিতে আসলেও এদের পোষাক অত্যন্ত পরিপাটি। প্যান্ট শার্ট কড়া করে আয়রন করা। বুড়িদের ঠোঁটে লাল টুকটুকে লিপিষ্টিক। মোটকথা বয়স বাড়ার সাথে এনাদের সৌখিনতা বাড়তে থাকে। অনেকে
একসময় সঙ্গী হারায়। তবুও দমে যায় না, একাই কফি শপে যায়, অন্য গ্রুপের সাথে ভিড়ে পরে। আরও বয়স বাড়লে শেষ আশ্রয়স্থল হয় বৃদ্ধাশ্রম। বয়সটাকে অনায়াসে নব্বুই, পচানব্বুই একশো পর্যন্ত টেনে নিয়ে যায়। অপারেশন করতে করতে এদের শরীরে আর কোন জায়গা থাকে না, একসময় ডাক্তাররা আর অপারেশন করতে চায়না, তারা রোগীর পরিবারের লোকজনদের বুঝিয়ে বলে একশো বছর বয়সে আর কোন অপারেশনের ধকল শরীর সহ্য করতে পারবে না। শরীর তারপরেও টেনে টেনে চলে কিছুদিন, তারপর নিভে যায়।
আমাদের সামনে হাসিখুশি চেহারার এক বৃদ্ধা বসেছে। ঘাড় ঘুরিয়ে আমার মেয়েদের সাথে কথা বলা শুরু করল। এইদেশের বুড়োবুড়ি বাচ্চাদের খুবই পছন্দ করে। যেচে এসে কথা বলা শুরু করে। এই বৃদ্ধার কথা খুবই মিঠা। আমার মেয়েদের সাথে অল্প সময়েই ভাব জমিয়ে ফেলল। পরে কথা প্রসঙ্গে বলেছে সে রিজাইনা বিশ্ববিদ্যালয়ে পার্ট-টাইমার শিক্ষকতা করে। উইন্টারের ক্লাস নেয় না, পৃথিবী ভ্রমনে বেড়িয়ে পরে। শীতের হাত থেকে বাঁচতে গরমেরদেশগুলোতে যায়। এই পর্যন্ত ৪২ টি দেশে ভ্রমণ করেছে। বুড়ি আমাকে জিজ্ঞেস করল আমরা অরিজিনালি কোথা থেকে এসেছি। বাংলাদেশের নাম বলতেই চিনতে পারল। ইদানিং বাংলাদেশের নাম এখানকার লোকজন বেশিরভাগই চেনে,কারণ যে বস্ত্র তারা পরিধান করে তার অর্ধেকই বাংলাদেশের তৈরি। অনেকেরই পৃথিবীর ম্যাপ সম্বন্ধে ধারণা কম, তাই বাংলাদেশের জিওগ্রাফিক্যাল লোকেশন টা তারা ধরতে পারে না। তখন বুঝিয়ে বলতে হয় আমাদের এক পাশে ভারত অন্যপাশে মায়ানমার,তারপরেও অনেকে চেনে না। এই বুড়ী অবশ্য বাংলাদেশ কোথায় অবস্থিত সেটা ভালো করেই জানে। সে বলল, আমি নেপাল পর্যন্ত গিয়েছি। ইচ্ছা আছে ভারত যাবার, বাংলাদেশেও যেতে পারি।
গার্ড এনাউন্স করল, ট্রেনে ড্রিংকসের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। একটি কুলার বক্সে বিয়ারের ক্যান ভর্তি করে রাখা হয়েছে। কিছু পেপসির ক্যানও আছে অবশ্য, আমরা পেপসি নিলাম। পেপসির দাম দুই ডলার, বিয়ারের দাম পাঁচ।
ট্রেন চলছে ১৮ মাইল গতিতে। সামনে কোন রোড ক্রসিং পড়লে তিনবার সিটি দিচ্ছে, সেটাই নাকি নিয়ম। গাড়ির ভিতরে সবাই খোশমেজাজে। ট্রেনে চেপে প্রেইরির ঘাসভূমি দেখার আলাদা মজা রয়েছে। এখানকার ভূমি বৈচিত্র্য পৃথিবীর অন্য কোন জায়গার মতো নয়। এখানকার মাটি যে পরিমাণ পানি ধরে রাখতে পারে তাতে বড় বৃক্ষ বাঁচতে পারে না, কিন্তু এই মাটিতে ঘাস এবং গুল্ম ভালো জন্মায়। আফ্রিকার সাভানার মতো। ঘাস খেয়ে যে সব প্রাণী জীবনধারণ করে বলাবাহুল্য তাদের আধিক্য এখানে বেশি যেমন গরু মহিষ হরিণ। একটু ভুল বললাম, এখন মহিষ নেই। একসময় মহিষদেরই আধিক্য ছিল। পরে ইউরোপিয়ান সেটলাররা এসে মহিষ মারা শুরু করে চামড়া ব্যবসার জন্য। তখন মোটামুটি সব মহিষ মেরে সাফ করে ফেলেছে। এইসব মহিষ দেখতে আমাদের দেশের মহিষদের মতো নয়, এদের নামটাও একটু ভিন্ন, বাইসন বলেই পরিচিত। এদের ঘাড় পাহাড়ের মত উঁচু হয়ে থাকে। কিছু কিছু রিজার্ভ এরিয়ায় এখনো এইসব বাইসন দেখতে পাওয়া যায়। এই সামারের প্রথমদিকে আমিই রাস্তার পাশে এরকম এক বাইসনকে ঘাস খেতে দেখেছি। খুব হিসাব করে এইসব বাইসন মারা হয়, এদের মাংসের দাম আকাশছোঁয়া, এক কেজির মূল্য ৫০ ডলারের উপরে।
ট্রেনের জানালা দিয়ে ধূ ধূ করা হালকা ঢেউ খেলানো ঘাস ভূমি দেখা যাচ্ছে, অনেক দূরে আকাশ দিগন্তের সাথে মিশে গেছে। আমাদের এই প্রভিন্সে ১০ লক্ষ মিঠা পানির লেক আছে ,কাজেই কিছুক্ষণ পর পর পানির দেখা মেলে। কিছুদিন আগেই এইসব জলাশয়ে পাতিহাস দেখতে পাওয়া যেত। এখন একটু একটু করে ঠান্ডা পড়তে শুরু করেছে, হাসগুলো কোথায় যেন চলে গেছে।
রেললাইনের একপাশে কিছু গর্ত দেখতে পেলাম। গর্তগুলো যে শিয়ালের তাতে কোন সন্দেহ নেই। আমাদের গ্রামে এরকম শিয়ালের গর্ত ছিল। সন্ধ্যাবেলা শিয়াল গর্ত থেকে বের হয়ে হুক্কা হুয়া ডাক দিত, গ্রামের কুকুরগুলো সেই ডাক শুনে একযোগ হয়ে শিয়ালের সাথে ঝগড়া করত। আমি মেয়েদেরকে বললাম, দেখ শিয়ালের গর্ত। শিয়াল শব্দটি তারা এখনো শেখেনি, তাই ট্রান্সলেট করে বলতে হল, ফক্স।
অন্যপাশের জানালার ধারে যারা বসেছিল তারা একসময় হৈ হৈ করে উঠল। কী ব্যাপার জানতে সবাই সেদিকে দৃষ্টি দিলাম। একদল উট দেখা যাচ্ছে। আমি যারপরনাই অবাক হয়ে গেলাম, মরুভূমির প্রাণী এখানে আসলো কিভাবে? শিক্ষক বুড়ি বলল, এগুলো উট নয়, এদের নাম লামা। ভেড়া এবং উটের সংমিশ্রন, শরীরটা ভেড়ার, গলা এবং মাথা উটের। সাউথ আমেরিকান প্রাণী, নর্থতেও দেখা যায়।
এরপর দুইধাপে হরিণ দেখা গেল, একবার একটি লোনার হরিণ ট্রেনের নীচেই প্রায় পড়ছিল, অল্পের জন্যে রক্ষা পেয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল। একটু পরেই একসাথে চারটি হরিণ দেখা গেল, এদের গায়ের রঙ কালচে। এই রঙা হরিণ আগে দেখিনি।
পৌনে একঘন্টার মাথায় আমরা হরাইজন স্টেশনে এসে পৌঁছলাম। এখানেই গ্রেইন-এলিভেটর রয়েছে।
গাড়ি চালিয়ে অনেকবার এলিভেটরের পাশ দিয়ে গিয়েছি। কোনদিন গাড়ি থামিয়ে ভাল করে পর্যবেক্ষণ করা হয়নি। আজকে দেখার সৌভাগ্য হল। ট্রেনের মহিলাটি আমাদেরকে এলিভেটরের ভিতরে নিয়ে গেল। এলিভেটর আবিস্কার করার আগে কৃষকরা বস্তায় করে গম ভর্তি করে মালগাড়িতে লোড দিত সেকথা আগেই বলেছি। এলিভেটরের মূল লক্ষ্য প্রচুর পরিমাণে শস্য ওজন করা, কোয়ালিটি চেক করা, মজুদ করা এবং ট্রান্সপোর্ট করা। পাইকারদের এজেন্ট থাকতো এখানে, শস্য বুঝে পাবার পর কৃষকদের পে করা হতো। মোটকথা গ্রেইন-এলিভেটর কৃষকদের ওয়ান-স্টপ বিক্রয় বিপনী ছিল। ফসল বিক্রয়যোগ্য হবার পরে কৃষকদের একমাত্র কাজ ছিল নিকটস্ত এলিভেটরে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করা। এখানে স্পষ্টত প্রাইস ফিক্সিংয়ের ব্যবস্থা রয়েছে। পাইকাররা যে মূল্য ধার্য করবে কৃষকরা সেই মূল্যেই বিক্রি করতে বাধ্য।পরে গভর্নমেন্টের এবং কো-অপারেটিভের হস্তক্ষেপের কারণে এই সমস্যা দূরীভূত হয়েছে।
এই এলিভেটরটি আশির দশকের মাঝামাঝি পরিত্যাক্ত হয়েছে। আমাদেরকে শস্য মাপার স্কেলের কাছে নিয়ে যাওয়া হল। শস্য বোঝাই ঘোড়ার গাড়ি স্কেলের উপরে দাঁড়িয়ে থাকতো, কার্টসহই ওজন নেয়া হতো, পরে গাড়ির ওজন বিয়োগ করে শস্যদানার নেট ওজন বের করা হতো। এই এলিভেটরটি পুরোপুরি কাঠের তৈরি, যখন তৈরি করা হয়েছিল তখন টিন সহজলভ্য ছিল না। গ্রেইন অতিশয় দাহ্য, সহজেই আগুন লেগে যাবার ভয় ছিল এবং আগুন লাগলে তা দ্রুত চারপাশে ছড়িয়ে পড়তো। তাই এখানে ধূমপান কঠোরভাবে মানা করা ছিল। স্কেলের পিছনে বড় বড় করে লেখা আছে নো স্মোকিং। লেখাটা এখনও জ্বলজ্বল করছে, মনে হচ্ছে কয়েকদিন আগেই লিখে রাখা হয়েছে। এলিভেটরের কাঠামো এখনো মজবুত। হয়তো আরো একশো বছর টিকে থাকবে। এই ধরনের পরিত্যক্ত বিল্ডিংয়ে বাদুর চামচিকে থাকার কথা, কিন্ত সেরকম কাউকে দেখা গেল না। তবে ইঁদুরের অস্তিত্ব বোঝা যাচ্ছে।
শস্য ওজন দেয়ার পরে বাষ্পচালিত লিফটের মাধ্যমে উপরে তোলা হত। উপরে অনেকগুলো স্টোররুম। একেক পাইকারদের জন্য একেকটা স্টোর। পরে যখন মাল অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়া হত তখন গ্রাভিটিকে কাজে লাগানো হতো। স্টোরের নিচে বড় ছিদ্র থাকে, সেটা খুলে দিয়ে পাইপের সাহায্যে শস্য সরাসরি ট্রেনে লোড করা হত। এই জন্যই এলিভেটরগুলো রেললাইনের সাথে অবস্থান করে। অনেকে এদেরকে স্টেশন ভেবে ভুল করে। এক অর্থে স্টেশনও বলা যায় যেহেতু ট্রেন এসে থামে।
হাইওয়ে তৈরি হবার পরে বড় বড় লরিতে করে শস্য পরিবহন শুরু হয়। তবে এখনো রেল লাইনের পাশে কিছু কার্যকরী এলিভেটর রয়েছে, সেগুলো কাঠের তৈরি নয়, টিনের তৈরি। আদিকালের কাঠের গ্রেইন-এলিভেটর এখন শুধুই হেরিটেজ, একসময় এগুলো নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।
ফেরার পথে সবাই একটু উৎসাহ হারিয়ে ফেলেছে, কেউ জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকছে না বরং নিজেদের মধ্যে গল্প গুজবে মশগুল। বাইরে কোন প্রাণী দেখা গেলে কন্ডাক্টর মহিলাটি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে, আমরা এক পলক দেখেই আবার গল্লে মেতে উঠছি সহযাত্রীর সাথে।
এবার আরচির গল্পটা বলি।
ভদ্রলোকের বয়স সাতানব্বুই। বাই বর্ন র্যাঞ্চার। কাউবয় টুপি পরে আছে । পরনে পরিস্কার জিন্স।
আরচির সাথে পরিচয় হল ডিপসাউথ পাইওনিয়ার মিউজিয়ামে।
এখানকার প্রবেশমূল্য জনপ্রতি পাঁচ ডলার। ট্রেনের প্যাসেঞ্জার হবার সুবাদে আমাদের কোন টিকিট লাগলো না।
বিশাল এলাকা জুড়ে অনেকগুলো ওয়ারহাউস জাতীয় বিল্ডিং। টিনের চালার কিছু অংশ কেটে কাঁচ লাগানো হয়েছে যাতে সূর্যের আলো দিয়ে ঘরের ভিতরটা আলোকিত করা যায়।
গত দুইশো বছরে এখানকার লোকদের জীবন জীবিকায় যেসব জিনিস ব্যবহৃত হয়েছে যেমন চাষ করার ট্রাক্টর, ঘোড়ার গাড়ি, অটোমোবাইল, গম মাড়াই করার যন্ত্র ইত্যাদির বিশাল এক কালেকশন। মিউজিয়ামের ভিতর অনেকগুলো বাড়ি । একটা উনিশ শতকের শেষের দিকের বাড়িতে ঢুকে পড়লাম। বেডরুমে একটা ১৪ ইঞ্চি টিভি, একেবারে প্রথম আমলের, নব ঘুরিয়ে চ্যানেল চেঞ্জ করতে হয়
শোবার ঘর, বসার ঘর, কিচেন সবগুলো ঘর পরিপাটি করে সেই আমলের জিনিস দিয়ে সাজানো। সোবার ঘরের বিছানা পরিপাটি করে সাজানো। আমি বিছানায় বসে একটু রেস্ট নিয়ে নিলাম। বিছানা এখনকার দিনের মত আরামদায়ক নয়, স্প্রিংয়ের তোষক। শোবার ঘরের এক কোণে একটা সিঙ্গার সেলাই মেশিন। এই বাড়ির গৃহিণী মনে হয় সেলাই করতো। ঠিক এই ধরণের একটা সিঙ্গার সেলাই মেশিন ছিল আমাদের বাড়িতে, আম্মা সেই মেশিন দিয়ে আমাদের জামাকাপড় তৈরি করতো।
বাড়িতে ব্যবহৃত জিনিস গুলো সবই পরিচিত, ছোটবেলায় বাংলাদেশের ঘরবাড়িতে এইসব জিনিস দেখতাম। একটার কথা বলতেই হয়, শো-কেস। আমাদের দেশে মধ্যবিত্তদের বাড়িতে একটা শো-কেস থাকবেই, সেইসব শোকেসে যত্ন করে চিনামাটির প্লেট, হাফ-প্লেট, কাপ পিরিচ ইত্যাদি সাজানো থাকে। বাড়ির বাবা হয়ত যুবক বয়সে কোন মেডেল পেয়েছে, সেটাও শো-কেসে সাজানো থাকতো। এই বাড়িতেও একটা শো-কেস দেখলাম, ভিতরে চীনা মাটির জিনিসে ভর্তি। রান্নাঘরে অনেক টিনের বাসন-কোসন, ঠিক একই রকম বাসনপত্র আমরাও ব্যবহার করেছিলাম। কাসা পরবর্তি যুগ হল টিনের যুগ। টিনের থালায় সাদা রঙ, বর্ডারটা মাছির গায়ের মত নীল। এরপরে আসে মেলামাইন যুগ। যাইহোক এই বাড়ির জিনিসপত্র দেখে মনে হচ্ছে আগেকার দিনে সারা পৃথিবী জুড়ে একই রকম ব্যবহার সামগ্রী ছিল।অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে সাম্প্রতিক কালে।
কত কত ধরনের বাড়ি ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে, সবগুলোতে ঢোকার সময় পেলাম না। একটা নাপিতের ঘরে ঢুকলাম। উঁচু নাপিতচেয়ার, দাড়ি কাটার ক্ষুর, আয়না সবই আমাদের দেশের নাপিতের দোকানের মতোই। এই জাদুঘর দেখে বেশ মজা পাচ্ছি। যারা প্রেইরি অঞ্চলে বসবাস করেন, তাদের অবশ্যই এই জাদুঘরটি দর্শন করা উচিত। বিশেষ করে যারা রিজাইনাতে থাকেন তাদের অবশ্যই এখানে আসা উচিত, রিজাইনা থেকে ওগেমার দূরত্ব একশো কিলোমিটারের একটু বেশি। জাদুঘরটি ওয়ার্থ-ভিজিটিং। শুধু মিউজিয়ামটি ঘুরে দেখার জন্য তিনঘন্টা সময় নিয়ে আসবেন।
এত বড় জাদুঘরে মাত্র একজন কর্মচারী, যে বৃদ্ধটি ফ্রন্টে বসে টিকিট বিক্রি করছিল সে-ই কিউরেটর। সকাল বেলায় এসে সবগুলো ঘরের তালা খুলে দেয়। সব ঘরের তালা খুলতে তার এক ঘন্টা সময় লেগে যায়, বিকালেও একই অবস্থা।
আজকে হঠাৎ করে ঠান্ডা পড়ায় সবগুলো বাড়ি ঘুরে দেখতে কষ্ট হচ্ছে। বাড়িগুলোতে বিদ্যুতের সরবরাহ নেই, অযথা খরচ, কয়জনই বা এই জাদুঘরে বেড়াতে আসে? আমি সময় নিয়ে সবকিছু দেখতে চাই, কিন্তু আমার স্ত্রী একেবারে উল্টো, সে তাড়াহুড়া করে দেখে আরেক বাড়িতে ঢুকে পড়ে। কাজেই একসময় সে হারিয়ে গেল। অসুবিধা নেই, হারিয়ে যাবে কোথায়? আমি একমনে এন্টিক দেখছি, এমন সময় দূর থেকে বৌয়ের উচ্চ কন্ঠ শোনা গেল, সে বলল, তুমি কোথায়?
এই যে আমি এখানে, বলে বাড়ি থেকে বেড়িয়ে পরলাম।
স্ত্রী কাছে এসে বলল, একটা বাড়ির সন্ধান পেয়েছি, ভেতরটা একেবারে টোস্টি ওয়ার্ম, দেখতে চাও ?
আমার হাত ঠাণ্ডায় জমে গেছে, আমি বললাম এক্ষুনি।
সেই বাড়িতে ঢুকেই আরচির সাথে আমার পরিচয় হলো। এই বাড়িটি আসলে একটা আর্ট গ্যালারি। পুরাতন বাড়ি নয়, নতুন। বিদ্যুৎ রয়েছে, হাই হিটিং দিয়ে রাখা হয়েছে। আরচি আমাকের স্বাগত জানিয়ে বলল, দরজাটা ভিড়িয়ে দাও, ঠান্ডা আসবে। আমার স্ত্রী একটু আগে এসে তার সাথে কথাবার্তা বলে গেছে, কিন্তু তার কিছুই মনে নেই, সাতানব্বুই বছর বয়সে মনে থাকবার কথাও নয়। আমার স্ত্রীকে সে আবার মাথা নুইয়ে স্বাগত জানালো।
আরচির সাথে কথাবার্তা বলে এবং গ্যালারির পেইন্টিংস দেখে যা বুঝলাম তা হল এই-
আর্চির মা এক ঘোড় সওয়ারী। মাত্র ষোল বছর বয়সে প্রিয় ঘোড়ায় চেপে একাই আমেরিকার কোন এক জায়গা থেকে উত্তরে যাত্রা করে, প্রেইরিতে ঘর বাধঁবে। ওগেমায় এসে মন স্থির হয়। একটি ষোড়শী মেয়ে কত প্রতিকূলতা অতিক্রম করেই মনে হয় এখানে ঘর বাঁধতে পেরেছিল। সেই ইতিহাসটা আরচির মুখ থেকেই শুনতে চাইছিলাম, কিন্তু বয়সের জন্য একসাথে অনেকক্ষণ কথা বলা তার পক্ষে সম্ভব নয়। কথা বলতে বলতে খেই হারিয়ে ফেলে। ছোট বাক্য বিনিময়ে সে ঠিক আছে। আমার মেয়েদের সাথে তার আলাপটা ভাল জমছে।
আরচির মা প্রেইরির সৌন্দর্য্যে বিমোহিত হয়েছিল, পেইন্টিিংস তার শখ, সে চেয়েছিল আজীবন প্রেইরির ছবি আঁকবে। এঁকেছেও প্রচুর। সেগুলো বেহাত হয়ে কোথায় কোথায় চলে গেছে। তার ছেলে আরচি এখন সেইসব ছবি উদ্ধার করে চলেছে। আরচি সম্পূর্ণ নিজের টাকায় এই আর্ট গ্যালারী তৈরী করেছে। যাদের কাছে আরচির মায়ের পেইন্টিংস ছিল, আরচির প্রজেক্টের কয়া শুনে তারা সেইসব পেইন্টিংস ফেরত পাঠাচ্ছে। আমরা শখানেক পেইন্টিংস দেখলাম। প্রত্যেকটা প্রফেশনাল আঁকিয়ের আঁকা পেইন্টিংস মনে হল। আরচি প্রত্যেকটা ছবির সাথে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে, কোন পেইন্টিং কোথা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে সেটা বর্ণনা করছে।
লোকজন শনি-রবিবার এই মিউজিয়াম দেখতে আসে। কারণ এই দুইদিনেই ট্রেনের প্রোগাম থাকে। আরচি প্রতি উইকএন্ডে নয়টা পাঁচটা অফিক করার মত আর্ট-গ্যালারির তত্ত্বাবধায়ন করে। এছাড়াও সপ্তাহের অন্য দিনে মিউজিয়ামে এসে কেউ যদি আরচির মায়ের আর্ট-গ্যালারি দেখতে চায় তাহলে ফোন করা মাত্র আরচি গাড়ি চালিয়ে এখানে চলে আসে। সে শহরে থাকে না,এখান থেকে বিশ মাইল দূরে একটি খামারবাড়িতে থাকে।
আমি অবাক হয়ে বললাম, তুমি এই বয়সে গাড়ি চালাও?
সে বলল, ইয়েস। গ্যালারির পাশে একটি পন্টয়াক গাড়ি পার্ক করা, সে বলল সেটিই তার গাড়ি।
এই বয়সে গাড়ি চালানোটা বাড়াবাড়ি মনে হচ্ছে। ইন্সুরেন্স কোম্পানি কোন হিসাবে তার লাইসেন্স বজায় রেখেছে মাথায় ঢুকলো না। একদিন বড় এক্সিডেন্ট হয়ে যাবে তো।
আরচির বাবা এই এলাকার মানুষ। আরচির মা তাকে বিয়ে করার পরে যে র্যাঞ্চটি তৈরি করেছিল, আরচিও সেটার দেখাশুনা করেই জীবন পার করে দেয়। এখন দেখছে আরচির এক ছেলে। তাদের সাথেই আরচি থাকে। আরচির বৌ গত হয়েছেন এক যুগের বেশি। তার কাউবয় টুপির ভিতরে তার বৌয়ের একটা ছবি আঠা দিয়ে লাগানো আছে। টুপি খুলে আরচি আমাদেরকে বৌয়ের ছবি দেখালো। বউয়ের কথা বলার সময় তার চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
আমার মেয়েরা আরচিকে বিভিন্ন প্রশ্ন করছিল।
আরচিও সিরিয়াসলি আমার মেয়েদের প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিল। আমার মেয়েদের বেশিরভাগ প্রশ্ন আরচির মাকে ঘিরে। সে কিভাবে ঘোড়া চালাতো, কিভাবে ছবি আঁকতো, কিভাবে রান্না করত- এইসব বিষয়ে প্রশ্ন। আরচি গর্ব করে মায়ের বিষয়ে কথা বলছে। মাকে বড় ভালবাসে সে।