সোমবার, সেপ্টেম্বর ২৪, ২০১৮

প্রেইরির দিনরাত্রি - ওগেমা


নি রবিবার আমরা বেরিয়ে পড়ি। কোন নির্দিষ্ট গন্তব্য থাকতে হবে এমন কোন কথা নেই। হয়তো হাইওয়ে থেকে অজানা কোন গ্রাভোল রোড ধরে এগিয়ে চললাম। পথের পাশে ক্যানলা অথবা সূর্যমুখী ফুলের ক্ষেত দেখে গাড়ি পুলওভার করি ,ফুল ছিড়ি, প্রজাপতির নাচানাচি দেখি। মেঠো পথের এক পাশ থেকে আরেক পাশে কোন ইঁদুর দৌড় দিয়ে পার হবার সময় একটি পুরো পরিবারকে সেলফি তুলতে দেখে থমকে যায়, বোঝার চেষ্টা করে এই ঝোপ-জঙ্গলে এত দেখাদেখির কী আছে?



প্রেইরিতে বড় গাছ থাকার কথা নয়, তারপরেও আমাদের এদিকে ছোটখাটো বন আছে, সেখানকার গাছগুলো এত সরু যে, দুহাত দিয়ে তাদের কোমড় জড়িয়ে ধরা যায়। এইসব বনে হরিণ এবং অন্যান্য প্রাণিদের আস্তানা। রাস্তার পাশে এরকম ফরেস্ট পড়লে ইঞ্জিন বন্ধ করে চুপচাপ অপেক্ষা করি হরিণ দর্শনের লোভে।
আজকে অবশ্য উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘোরাফেরা নয়। আজকের ভ্রমণ তিন মাস আগে থেকেই প্লান করা। আমাদের বাড়ি থেকে দুইশো কিলোমিটার পশ্চিমে ওগেমা নামের এক ছোট শহর আছে। আর দশটা ছোট শহরের মতই এর চেহারা, মেইন রোড নামের একমাত্র রোড, সেই রোডে একটি ডাকঘর,একটি পুরোনো রেস্তোরা এবং একটি পানির ট্যাং এইসবই থাকার কথা। কিন্ত এই শহরটা একটু আলাদা, এখানে একটি রেলস্টেশন আছে, সামারে প্রতি উইকএণ্ডে ট্যুরিস্টদের নিয়ে একটি হেরিটেজ ট্রেন ছাড়ে, সাউদার্ন প্রেইরি রেলওয়ে নামের এক কোম্পানি এই ট্রেনের মালিক।
১৮৮২ থেকে ১৯৩১ সাল পর্যন্ত অন্যান্য জায়গার মত প্রেইরিতেও ব্যাপকভাবে রেলের কার্যক্রম চলে। প্রত্যেকটি কমিউনিটির পাশে রেলস্টেশন তৈরি করা হয়। বড় শহরগুলোতে সেইসব রেলস্টেশনের কোন চিহ্ণ আজ আর অবশিষ্ট নেই কিন্ত ছোট শহরগুলোয় এখনো রেলস্টেশনের ধ্বংসাবশেষ রয়েছে। এইসব ছোট শহরে স্টেশন রোড নামের একটি সড়ক এখনো আছে।
প্যাসেঞ্জার ট্রেনের পাশাপাশি শস্য পরিবহনের জন্য ছিল মালগাড়ি ।কৃষকরা ঘোড়ার গাড়িতে গমের বস্তা বোঝাই করে স্টেশনে আসত, মালগাড়িতে সেইসব বস্তা লোড দেয়া হত। এখানকার জমিতে এত এত ফসল ফলে যে বস্তায় ফসল ভরে রাখা এফিসিয়েন্ট নয়, প্রয়োজন বড় আকারের স্টোরেজ। কাজেই গ্রেইন-এলিভেটর নামের এক ধরণের সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। গ্রেইন-এলিভেটর আসলে এক মাল্টি-পারপাস কমপ্লেক্স। এর কথা পরে বিশদভাবে বলবো। পুরো প্রেইরি জুরে এইসব এলিভেটর তৈরি করা হয়েছিল।এরা কালের সাক্ষী হিসেবে এখনো দাঁড়িয়ে আছে। প্রেইরির ল্যান্ডস্কেপে দুই ধরনের স্থাপত্যই দেখা যায়, এইসব এলিভেটর এবং ওল্ড ফ্যাশনড বার্নহাউস। আজকে ট্রেনে চেপে আমাদেরকে এরকম একটা এলিভেটর দেখাতে নিয়ে যাবে।
তিনমাস আগে অনলাইনে টিকিট কাটতে গিয়ে দেখি এই ট্রেন ভ্রমণের অনেকগুলো ভার্সন রয়েছে। যেমন একটি ডিলের নাম ট্রেন-ডাকাতি। চলন্ত ট্রেনে যাত্রীর বেশে লুকিয়ে থাকা কোন ডাকাত হঠাৎ করে চেন টেনে দিবে। তারপর ঝোপের পিছনে লুকিয়ে থাকা অন্যান্য ডাকাত হুড়মুড় করে ট্রেনে উঠে পড়বে যাত্রীদের মালামাল লুট করার জন্য।
আরেকটি ডিল রয়েছে ছোট বাচ্চাদের জন্য। অনবোর্ড বাচ্চাদেরকে নানা ধরণের এক্টিভিটিজ করানো হবে, যেমন তাদের হাতে পায়ে টাট্টু এঁকে দেয়া, ছবিতে কালার করানো ইত্যাদি।
অ্যালকোহলিকদের জন্য একটি ডিল রাখা হয়েছে। ট্রেনে পর্যাপ্ত পরিমাণে মদ রাখা হবে, যাত্রীরা ইচ্ছামত পান করবে। জঙ্গলের মধ্যে ট্রেন থামিয়ে একটা গম্বুজের মধ্যে ডিনার করানো হবে এইসব মদপ্রেমিকদের।
আমরা ট্রেন ডাকাতির টিকেট কাটতে চাইলাম, কারণ ব্যাপারটায় রোমাঞ্চ আছে। কিন্তু ডাকাতির ট্রেন পুরো সিজনের জন্য সোল্ড-আউট হয়ে গিয়েছে। বাচ্চাদের টাট্টুওয়ালা ট্রেনেরও একই অবস্থা। কাজেই রেগুলার একটি ডিল নিতে হয়েছিল।
তিনমাস পার হয়ে আজকে ওগেমা যাবার দিন পড়েছে। কিন্তু আকাশ সহায় নয়, সকালে দুই পশলা বৃষ্টি হয়েছে, আকাশে আরো কিছু মেঘ রেডি হয়ে বসে আছে, আমরা রাস্তায় নামলেই ফটাস ফটাস করে ফাটবে।
আমাদের বাসা থেকে ওয়েবার্ন হয়ে ওগেমা যেতে হবে। কোন হাইওয়ে বদলের ব্যাপার নেই, আমাদের বাড়ির পাশ দিয়ে যে হাইওয়ে-১৩ বয়ে গেছে সেটাই আমাদেরকে ওগেমা পর্যন্ত নিয়ে যাবে। ওয়েবার্ন দশহাজার লোকের শহর। বড় গ্রোসারি স্টোর রয়েছে। আমার বৌ প্রস্তাব করল, ওদিক দিয়েই যখন যাচ্ছি, তখন মাসের বাজারটা সেড়ে ফেলা উচিত হবে। আমি বললাম, আজকে রোববার, ফিরে আসার সময় পাঁচটা পার হয়ে যাবে, দোকান খোলা থাকবে না।
ওগেমার ট্রেন দেড়টার সময়। বৌ বলল, তাহলে আগেই ওয়েবার্নে বাজার করে যাই।
তথাস্তু, আমি বৌকে বললাম।
ওয়েবার্নে বাজার করতে একঘন্টার বেশি সময় কেটে গেল। তারপর আমাদের সবার খিদে পেল। বাচ্চারা খিদে সহ্য করতে পারবে না, একটা টিম হর্টনে ঢুকলাম তাড়াতাড়ি কিছু মুখে দিতে। কিন্ত মেয়েরা যে গতিতে খাচ্ছে হিসাব করে দেখলাম ট্রেন ফেল হবে। মেয়েরা কতদিন থেকে প্রস্তুতি নিয়ে আছে ট্রেনে চাপবে, এখন ট্রেন ফেল করলে তাদেরকে কী বলে সান্তনা দেব?
বৌকে বললাম, খাওয়া বন্ধ করতে হয়, এখনি রওয়ানা না দিলে ট্রেন ধরা যাবে না।
কিছু হবে না, বৌ উত্তর দিল।
আমি বললাম, এদেশের মানুষ এমনিতে ভালো, এরা হাসিমুখে কথা বলবে, কুশল আদান প্রদান করবে, আমরা ট্রেন মিস করলে দুঃখপ্রকাশ করবে, কিন্তু আমাদের জন্য এক মিনিটও অপেক্ষা করবে না, ট্রেন ঠিকই ছেড়ে দিবে।
কাজেই বাদবাকি খাবার প্যাকেট করে নেয়া হল। গাড়িতে বসে খাওয়া যাবে।
হাইওয়ে ১৩ দিয়ে ১২০ কিলোমিটার বেগে ছুটে চললাম। একশোর রাস্তা, অনেকে একশো বিশে চালায়, আমি সর্বোচ্চ একশো দশে চালাতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। এর বেশি স্পিডে চালালে মনে হয় গাড়ি কাঁপছে। আজকেই ব্যতিক্রম। স্পিডিং টিকিট জুটতে পারে ভাগ্যে, কিছুই করার নেই।
ওগেমা স্টেশনে পৌঁছে দেখি হাতে পাঁচ মিনিট সময় আছে, ট্রেনের ইঞ্জিন স্টার্ট দেয়া হয়ে গেছে।
আমি বৌকে বললাম, তুমি দৌঁড়ে গিয়ে ট্রেন থামাও, আমি মেয়েদেরকে নামাচ্ছি।
টিকিট কাউন্টারের লোকজন আমাদের জন্যই অপেক্ষা করছিল। আমার স্ত্রী জানালার কাছে যেতেই তারা বলল, তোমার লাস্ট নেম কী তারেক? বৌ বলল, না , আমার হাজবেন্ডের লাস্ট নেম তারেক। ও বাচ্চাদের গাড়ি থেকে নামাচ্ছে।
ওই হল, বলে কাউন্টারের মহিলাটি আমার বৌকে চারটি টিকিট ধরিয়ে দিল।
টিকিট না দিলেও পারতো, কেননা আমাদের কাছে অনলাইন অর্ডারের কপি রয়েছে। টিকিট দেয়ার কারণ টিকিটের একটা অংশ এখানকার এক জাদুঘরে যাবার কমপ্লিমেন্টারি টিকিট, জাদুঘরটি নাকি অবশ্য দ্রষ্টব্য। পরে এর কথা বলব, সেখানে একজন ইন্টারেস্টিং মানুষের সাথে পরিচয় হয়েছে, নাম আরচি।
আমরা ট্রেনে চাপার সাথে সাথেই ট্রেন ছেড়ে দিল। আমাদের গন্তব্য হরাইজন নামক এক গ্রাম, সেখানেই রয়েছে গ্রেইন-এলিভেটর যার কথা আগে বলেছি।
ট্রেনের গার্ড ভদ্রলোকটি পরিপাটি করে ইউনিফর্ম পরেছে, তাকে টাইটানিক জাহাজের ক্যাপ্টেনের মত লাগছে। মাথায় যে হ্যাট পরেছে সেটা শুধুমাত্র রেলের গার্ড, সিপের ক্যাপ্টেন এবং উড়োজাহাজের পাইলটরাই পরে। একমাত্র ব্যতিক্রম নৌ বাহিনীর লোকেরা, তারা শুকনো জায়গায় বসে থাকলেও এই হ্যাট পরিধান করে।
ট্রেনে আরও একজন কর্মচারী রয়েছে, ইনি মহিলা, এঁর বয়সও ভালই হবে, ষাটের উপরে তো হবেই। বোঝা যাচ্ছে এরা সবাই ভলান্টারিলি সার্ভিস দিচ্ছে। মহিলাটির হাতে একটি মাইক, সে আমাদেরকে অত্র অঞ্চলের ইতিহাস বর্ণনা করবে।
গাড়িতে একটিমাত্র বগি। গাড়ির ইঞ্জিন ১৯৫০ সালের তৈরি। বগিটি ১৯২০ এর দশকের। ইচ্ছা করেই হয়তো সংস্কার করা হয়নি। ১৯২০ সালের একটা আবহাওয়া পাওয়া গেল।
ছোটবেলায় যেরকম ট্রেন দেখেছিলাম এই ট্রেনের জানালাগুলো সেরকমই। জানালা তুলে দিলে সড়াৎ করে নেমে যাচ্ছে। গার্ড বলল, সাবধান, জানালার কাঁচ দিয়ে হাত কেটে যেতে পারে। জানালা খোলার চেষ্টা না করাই ভাল।
ট্রেনে হিটিং নেই, মাথার ওপরে কয়েকটি ফ্যান ঘুরছে। বাইরে ১১ ডিগ্রী সে: তাপমাত্রা, এখন ফ্যানের দরকার নেই। গার্ড সাহেবকে বললাম, আমাদের মাথার উপরের ফ্যানটা বন্ধ করতে। সে বলল, ফ্যান অফ করার বন্দোবস্ত নেই। ইঞ্জিনের সাথে ডাইরেক্ট লাইন করা, ইঞ্জিন বন্ধ করলেই ফ্যান বন্ধ হবে।
এই কোম্পানি গত ছয়বছর ধরে ট্রেন সার্ভিস চালু করেছে। মহিলাটি বলল, তাদের অত টাকাপয়সা নেই, তাই পেপারে বা টিভিতে বিজ্ঞাপন দিতে পারে না। ফ্রিতে একটা ফেসবুক পেজ খুলেছে, সেখানে দশ হাজার ফলোয়ার আছে। সেই পেজের মাধ্যমেই যতটা সম্ভব এডভার্টাইজমেন্ট করা হয়। আমাকে জিজ্ঞেস করল আমি কার কাছ থেকে তাদের কথা শুনেছি।
আমি বললাম এক বন্ধুর কাছ থেকে।
বুড়ি বলল, সেই বন্ধু কার কাছ থেকে শুনেছে?
আমি বললাম, সে গতবছর এই ট্রেনে চেপেছিল। সেও কোন এক বন্ধুর কাছে শুনে ট্রেনে চেপেছে। কাজেই দেখা যাচ্ছে ওয়ার্ড অফ মাউথের মাধ্যমেই তোমাদের ভাল এড হচ্ছে। ফেসবুকের পেজ খুলে মনে হয়না কোন লাভ হয়েছে। দশ হাজার ফলোয়ারের কথা বলছ? ফেসবুকের ফলোয়ারের কাজ শুধু ফলো করা পর্যন্ত, তার বাইরে কিছুই নয়।
ভেবেছিলাম ট্রেনে অনেক বাচ্চা কাচ্চা দেখতে পাবো, কিন্তু আমরা এবং আরেকটি পরিবার ছাড়া কারও বাচ্চা নেই। অধিকাংশ লোক সদ্য রিটায়ার্ড করা, স্বামী-স্ত্রী জোড়া বেঁধে এসেছে। এই দেশের লোকেরা রিটায়ার্ড করার পরে আসল ফান শুরু করে। দর্শনীয় জায়গাগুলো ঘুরে ফিরে দেখে। অনেকে পৃথিবী ভ্রমনে বেরিয়ে পড়ে। বছর দশ-বারো ফান করার পরে এরা সিনিয়র সিটিজেনের খাতায় নাম লেখায়। তখন তাদের কাজ হয় বাড়ি থেকে গাড়ি চালিয়ে নিকটস্থ কফির দোকানে গিয়ে আড্ডা দেয়া। আড্ডা দিতে আসলেও এদের পোষাক অত্যন্ত পরিপাটি। প্যান্ট শার্ট কড়া করে আয়রন করা। বুড়িদের ঠোঁটে লাল টুকটুকে লিপিষ্টিক। মোটকথা বয়স বাড়ার সাথে এনাদের সৌখিনতা বাড়তে থাকে। অনেকে
একসময় সঙ্গী হারায়। তবুও দমে যায় না, একাই কফি শপে যায়, অন্য গ্রুপের সাথে ভিড়ে পরে। আরও বয়স বাড়লে শেষ আশ্রয়স্থল হয় বৃদ্ধাশ্রম। বয়সটাকে অনায়াসে নব্বুই, পচানব্বুই একশো পর্যন্ত টেনে নিয়ে যায়। অপারেশন করতে করতে এদের শরীরে আর কোন জায়গা থাকে না, একসময় ডাক্তাররা আর অপারেশন করতে চায়না, তারা রোগীর পরিবারের লোকজনদের বুঝিয়ে বলে একশো বছর বয়সে আর কোন অপারেশনের ধকল শরীর সহ্য করতে পারবে না। শরীর তারপরেও টেনে টেনে চলে কিছুদিন, তারপর নিভে যায়।
আমাদের সামনে হাসিখুশি চেহারার এক বৃদ্ধা বসেছে। ঘাড় ঘুরিয়ে আমার মেয়েদের সাথে কথা বলা শুরু করল। এইদেশের বুড়োবুড়ি বাচ্চাদের খুবই পছন্দ করে। যেচে এসে কথা বলা শুরু করে। এই বৃদ্ধার কথা খুবই মিঠা। আমার মেয়েদের সাথে অল্প সময়েই ভাব জমিয়ে ফেলল। পরে কথা প্রসঙ্গে বলেছে সে রিজাইনা বিশ্ববিদ্যালয়ে পার্ট-টাইমার শিক্ষকতা করে। উইন্টারের ক্লাস নেয় না, পৃথিবী ভ্রমনে বেড়িয়ে পরে। শীতের হাত থেকে বাঁচতে গরমেরদেশগুলোতে যায়। এই পর্যন্ত ৪২ টি দেশে ভ্রমণ করেছে। বুড়ি আমাকে জিজ্ঞেস করল আমরা অরিজিনালি কোথা থেকে এসেছি। বাংলাদেশের নাম বলতেই চিনতে পারল। ইদানিং বাংলাদেশের নাম এখানকার লোকজন বেশিরভাগই চেনে,কারণ যে বস্ত্র তারা পরিধান করে তার অর্ধেকই বাংলাদেশের তৈরি। অনেকেরই পৃথিবীর ম্যাপ সম্বন্ধে ধারণা কম, তাই বাংলাদেশের জিওগ্রাফিক্যাল লোকেশন টা তারা ধরতে পারে না। তখন বুঝিয়ে বলতে হয় আমাদের এক পাশে ভারত অন্যপাশে মায়ানমার,তারপরেও অনেকে চেনে না। এই বুড়ী অবশ্য বাংলাদেশ কোথায় অবস্থিত সেটা ভালো করেই জানে। সে বলল, আমি নেপাল পর্যন্ত গিয়েছি। ইচ্ছা আছে ভারত যাবার, বাংলাদেশেও যেতে পারি।
গার্ড এনাউন্স করল, ট্রেনে ড্রিংকসের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। একটি কুলার বক্সে বিয়ারের ক্যান ভর্তি করে রাখা হয়েছে। কিছু পেপসির ক্যানও আছে অবশ্য, আমরা পেপসি নিলাম। পেপসির দাম দুই ডলার, বিয়ারের দাম পাঁচ।
ট্রেন চলছে ১৮ মাইল গতিতে। সামনে কোন রোড ক্রসিং পড়লে তিনবার সিটি দিচ্ছে, সেটাই নাকি নিয়ম। গাড়ির ভিতরে সবাই খোশমেজাজে। ট্রেনে চেপে প্রেইরির ঘাসভূমি দেখার আলাদা মজা রয়েছে। এখানকার ভূমি বৈচিত্র্য পৃথিবীর অন্য কোন জায়গার মতো নয়। এখানকার মাটি যে পরিমাণ পানি ধরে রাখতে পারে তাতে বড় বৃক্ষ বাঁচতে পারে না, কিন্তু এই মাটিতে ঘাস এবং গুল্ম ভালো জন্মায়। আফ্রিকার সাভানার মতো। ঘাস খেয়ে যে সব প্রাণী জীবনধারণ করে বলাবাহুল্য তাদের আধিক্য এখানে বেশি যেমন গরু মহিষ হরিণ। একটু ভুল বললাম, এখন মহিষ নেই। একসময় মহিষদেরই আধিক্য ছিল। পরে ইউরোপিয়ান সেটলাররা এসে মহিষ মারা শুরু করে চামড়া ব্যবসার জন্য। তখন মোটামুটি সব মহিষ মেরে সাফ করে ফেলেছে। এইসব মহিষ দেখতে আমাদের দেশের মহিষদের মতো নয়, এদের নামটাও একটু ভিন্ন, বাইসন বলেই পরিচিত। এদের ঘাড় পাহাড়ের মত উঁচু হয়ে থাকে। কিছু কিছু রিজার্ভ এরিয়ায় এখনো এইসব বাইসন দেখতে পাওয়া যায়। এই সামারের প্রথমদিকে আমিই রাস্তার পাশে এরকম এক বাইসনকে ঘাস খেতে দেখেছি। খুব হিসাব করে এইসব বাইসন মারা হয়, এদের মাংসের দাম আকাশছোঁয়া, এক কেজির মূল্য ৫০ ডলারের উপরে।
ট্রেনের জানালা দিয়ে ধূ ধূ করা হালকা ঢেউ খেলানো ঘাস ভূমি দেখা যাচ্ছে, অনেক দূরে আকাশ দিগন্তের সাথে মিশে গেছে। আমাদের এই প্রভিন্সে ১০ লক্ষ মিঠা পানির লেক আছে ,কাজেই কিছুক্ষণ পর পর পানির দেখা মেলে। কিছুদিন আগেই এইসব জলাশয়ে পাতিহাস দেখতে পাওয়া যেত। এখন একটু একটু করে ঠান্ডা পড়তে শুরু করেছে, হাসগুলো কোথায় যেন চলে গেছে।
রেললাইনের একপাশে কিছু গর্ত দেখতে পেলাম। গর্তগুলো যে শিয়ালের তাতে কোন সন্দেহ নেই। আমাদের গ্রামে এরকম শিয়ালের গর্ত ছিল। সন্ধ্যাবেলা শিয়াল গর্ত থেকে বের হয়ে হুক্কা হুয়া ডাক দিত, গ্রামের কুকুরগুলো সেই ডাক শুনে একযোগ হয়ে শিয়ালের সাথে ঝগড়া করত। আমি মেয়েদেরকে বললাম, দেখ শিয়ালের গর্ত। শিয়াল শব্দটি তারা এখনো শেখেনি, তাই ট্রান্সলেট করে বলতে হল, ফক্স।
অন্যপাশের জানালার ধারে যারা বসেছিল তারা একসময় হৈ হৈ করে উঠল। কী ব্যাপার জানতে সবাই সেদিকে দৃষ্টি দিলাম। একদল উট দেখা যাচ্ছে। আমি যারপরনাই অবাক হয়ে গেলাম, মরুভূমির প্রাণী এখানে আসলো কিভাবে? শিক্ষক বুড়ি বলল, এগুলো উট নয়, এদের নাম লামা। ভেড়া এবং উটের সংমিশ্রন, শরীরটা ভেড়ার, গলা এবং মাথা উটের। সাউথ আমেরিকান প্রাণী, নর্থতেও দেখা যায়।
এরপর দুইধাপে হরিণ দেখা গেল, একবার একটি লোনার হরিণ ট্রেনের নীচেই প্রায় পড়ছিল, অল্পের জন্যে রক্ষা পেয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল। একটু পরেই একসাথে চারটি হরিণ দেখা গেল, এদের গায়ের রঙ কালচে। এই রঙা হরিণ আগে দেখিনি।
পৌনে একঘন্টার মাথায় আমরা হরাইজন স্টেশনে এসে পৌঁছলাম। এখানেই গ্রেইন-এলিভেটর রয়েছে।
গাড়ি চালিয়ে অনেকবার এলিভেটরের পাশ দিয়ে গিয়েছি। কোনদিন গাড়ি থামিয়ে ভাল করে পর্যবেক্ষণ করা হয়নি। আজকে দেখার সৌভাগ্য হল। ট্রেনের মহিলাটি আমাদেরকে এলিভেটরের ভিতরে নিয়ে গেল। এলিভেটর আবিস্কার করার আগে কৃষকরা বস্তায় করে গম ভর্তি করে মালগাড়িতে লোড দিত সেকথা আগেই বলেছি। এলিভেটরের মূল লক্ষ্য প্রচুর পরিমাণে শস্য ওজন করা, কোয়ালিটি চেক করা, মজুদ করা এবং ট্রান্সপোর্ট করা। পাইকারদের এজেন্ট থাকতো এখানে, শস্য বুঝে পাবার পর কৃষকদের পে করা হতো। মোটকথা গ্রেইন-এলিভেটর কৃষকদের ওয়ান-স্টপ বিক্রয় বিপনী ছিল। ফসল বিক্রয়যোগ্য হবার পরে কৃষকদের একমাত্র কাজ ছিল নিকটস্ত এলিভেটরে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করা। এখানে স্পষ্টত প্রাইস ফিক্সিংয়ের ব্যবস্থা রয়েছে। পাইকাররা যে মূল্য ধার্য করবে কৃষকরা সেই মূল্যেই বিক্রি করতে বাধ্য।পরে গভর্নমেন্টের এবং কো-অপারেটিভের হস্তক্ষেপের কারণে এই সমস্যা দূরীভূত হয়েছে।
এই এলিভেটরটি আশির দশকের মাঝামাঝি পরিত্যাক্ত হয়েছে। আমাদেরকে শস্য মাপার স্কেলের কাছে নিয়ে যাওয়া হল। শস্য বোঝাই ঘোড়ার গাড়ি স্কেলের উপরে দাঁড়িয়ে থাকতো, কার্টসহই ওজন নেয়া হতো, পরে গাড়ির ওজন বিয়োগ করে শস্যদানার নেট ওজন বের করা হতো। এই এলিভেটরটি পুরোপুরি কাঠের তৈরি, যখন তৈরি করা হয়েছিল তখন টিন সহজলভ্য ছিল না। গ্রেইন অতিশয় দাহ্য, সহজেই আগুন লেগে যাবার ভয় ছিল এবং আগুন লাগলে তা দ্রুত চারপাশে ছড়িয়ে পড়তো। তাই এখানে ধূমপান কঠোরভাবে মানা করা ছিল। স্কেলের পিছনে বড় বড় করে লেখা আছে নো স্মোকিং। লেখাটা এখনও জ্বলজ্বল করছে, মনে হচ্ছে কয়েকদিন আগেই লিখে রাখা হয়েছে। এলিভেটরের কাঠামো এখনো মজবুত। হয়তো আরো একশো বছর টিকে থাকবে। এই ধরনের পরিত্যক্ত বিল্ডিংয়ে বাদুর চামচিকে থাকার কথা, কিন্ত সেরকম কাউকে দেখা গেল না। তবে ইঁদুরের অস্তিত্ব বোঝা যাচ্ছে।
শস্য ওজন দেয়ার পরে বাষ্পচালিত লিফটের মাধ্যমে উপরে তোলা হত। উপরে অনেকগুলো স্টোররুম। একেক পাইকারদের জন্য একেকটা স্টোর। পরে যখন মাল অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়া হত তখন গ্রাভিটিকে কাজে লাগানো হতো। স্টোরের নিচে বড় ছিদ্র থাকে, সেটা খুলে দিয়ে পাইপের সাহায্যে শস্য সরাসরি ট্রেনে লোড করা হত। এই জন্যই এলিভেটরগুলো রেললাইনের সাথে অবস্থান করে। অনেকে এদেরকে স্টেশন ভেবে ভুল করে। এক অর্থে স্টেশনও বলা যায় যেহেতু ট্রেন এসে থামে।
হাইওয়ে তৈরি হবার পরে বড় বড় লরিতে করে শস্য পরিবহন শুরু হয়। তবে এখনো রেল লাইনের পাশে কিছু কার্যকরী এলিভেটর রয়েছে, সেগুলো কাঠের তৈরি নয়, টিনের তৈরি। আদিকালের কাঠের গ্রেইন-এলিভেটর এখন শুধুই হেরিটেজ, একসময় এগুলো নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।
ফেরার পথে সবাই একটু উৎসাহ হারিয়ে ফেলেছে, কেউ জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকছে না বরং নিজেদের মধ্যে গল্প গুজবে মশগুল। বাইরে কোন প্রাণী দেখা গেলে কন্ডাক্টর মহিলাটি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে, আমরা এক পলক দেখেই আবার গল্লে মেতে উঠছি সহযাত্রীর সাথে।
এবার আরচির গল্পটা বলি।
ভদ্রলোকের বয়স সাতানব্বুই। বাই বর্ন র্যাঞ্চার। কাউবয় টুপি পরে আছে । পরনে পরিস্কার জিন্স।
আরচির সাথে পরিচয় হল ডিপসাউথ পাইওনিয়ার মিউজিয়ামে।
এখানকার প্রবেশমূল্য জনপ্রতি পাঁচ ডলার। ট্রেনের প্যাসেঞ্জার হবার সুবাদে আমাদের কোন টিকিট লাগলো না।
বিশাল এলাকা জুড়ে অনেকগুলো ওয়ারহাউস জাতীয় বিল্ডিং। টিনের চালার কিছু অংশ কেটে কাঁচ লাগানো হয়েছে যাতে সূর্যের আলো দিয়ে ঘরের ভিতরটা আলোকিত করা যায়।
গত দুইশো বছরে এখানকার লোকদের জীবন জীবিকায় যেসব জিনিস ব্যবহৃত হয়েছে যেমন চাষ করার ট্রাক্টর, ঘোড়ার গাড়ি, অটোমোবাইল, গম মাড়াই করার যন্ত্র ইত্যাদির বিশাল এক কালেকশন। মিউজিয়ামের ভিতর অনেকগুলো বাড়ি । একটা উনিশ শতকের শেষের দিকের বাড়িতে ঢুকে পড়লাম। বেডরুমে একটা ১৪ ইঞ্চি টিভি, একেবারে প্রথম আমলের, নব ঘুরিয়ে চ্যানেল চেঞ্জ করতে হয়
শোবার ঘর, বসার ঘর, কিচেন সবগুলো ঘর পরিপাটি করে সেই আমলের জিনিস দিয়ে সাজানো। সোবার ঘরের বিছানা পরিপাটি করে সাজানো। আমি বিছানায় বসে একটু রেস্ট নিয়ে নিলাম। বিছানা এখনকার দিনের মত আরামদায়ক নয়, স্প্রিংয়ের তোষক। শোবার ঘরের এক কোণে একটা সিঙ্গার সেলাই মেশিন। এই বাড়ির গৃহিণী মনে হয় সেলাই করতো। ঠিক এই ধরণের একটা সিঙ্গার সেলাই মেশিন ছিল আমাদের বাড়িতে, আম্মা সেই মেশিন দিয়ে আমাদের জামাকাপড় তৈরি করতো।
বাড়িতে ব্যবহৃত জিনিস গুলো সবই পরিচিত, ছোটবেলায় বাংলাদেশের ঘরবাড়িতে এইসব জিনিস দেখতাম। একটার কথা বলতেই হয়, শো-কেস। আমাদের দেশে মধ্যবিত্তদের বাড়িতে একটা শো-কেস থাকবেই, সেইসব শোকেসে যত্ন করে চিনামাটির প্লেট, হাফ-প্লেট, কাপ পিরিচ ইত্যাদি সাজানো থাকে। বাড়ির বাবা হয়ত যুবক বয়সে কোন মেডেল পেয়েছে, সেটাও শো-কেসে সাজানো থাকতো। এই বাড়িতেও একটা শো-কেস দেখলাম, ভিতরে চীনা মাটির জিনিসে ভর্তি। রান্নাঘরে অনেক টিনের বাসন-কোসন, ঠিক একই রকম বাসনপত্র আমরাও ব্যবহার করেছিলাম। কাসা পরবর্তি যুগ হল টিনের যুগ। টিনের থালায় সাদা রঙ, বর্ডারটা মাছির গায়ের মত নীল। এরপরে আসে মেলামাইন যুগ। যাইহোক এই বাড়ির জিনিসপত্র দেখে মনে হচ্ছে আগেকার দিনে সারা পৃথিবী জুড়ে একই রকম ব্যবহার সামগ্রী ছিল।অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে সাম্প্রতিক কালে।
কত কত ধরনের বাড়ি ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে, সবগুলোতে ঢোকার সময় পেলাম না। একটা নাপিতের ঘরে ঢুকলাম। উঁচু নাপিতচেয়ার, দাড়ি কাটার ক্ষুর, আয়না সবই আমাদের দেশের নাপিতের দোকানের মতোই। এই জাদুঘর দেখে বেশ মজা পাচ্ছি। যারা প্রেইরি অঞ্চলে বসবাস করেন, তাদের অবশ্যই এই জাদুঘরটি দর্শন করা উচিত। বিশেষ করে যারা রিজাইনাতে থাকেন তাদের অবশ্যই এখানে আসা উচিত, রিজাইনা থেকে ওগেমার দূরত্ব একশো কিলোমিটারের একটু বেশি। জাদুঘরটি ওয়ার্থ-ভিজিটিং। শুধু মিউজিয়ামটি ঘুরে দেখার জন্য তিনঘন্টা সময় নিয়ে আসবেন।
এত বড় জাদুঘরে মাত্র একজন কর্মচারী, যে বৃদ্ধটি ফ্রন্টে বসে টিকিট বিক্রি করছিল সে-ই কিউরেটর। সকাল বেলায় এসে সবগুলো ঘরের তালা খুলে দেয়। সব ঘরের তালা খুলতে তার এক ঘন্টা সময় লেগে যায়, বিকালেও একই অবস্থা।
আজকে হঠাৎ করে ঠান্ডা পড়ায় সবগুলো বাড়ি ঘুরে দেখতে কষ্ট হচ্ছে। বাড়িগুলোতে বিদ্যুতের সরবরাহ নেই, অযথা খরচ, কয়জনই বা এই জাদুঘরে বেড়াতে আসে? আমি সময় নিয়ে সবকিছু দেখতে চাই, কিন্তু আমার স্ত্রী একেবারে উল্টো, সে তাড়াহুড়া করে দেখে আরেক বাড়িতে ঢুকে পড়ে। কাজেই একসময় সে হারিয়ে গেল। অসুবিধা নেই, হারিয়ে যাবে কোথায়? আমি একমনে এন্টিক দেখছি, এমন সময় দূর থেকে বৌয়ের উচ্চ কন্ঠ শোনা গেল, সে বলল, তুমি কোথায়?
এই যে আমি এখানে, বলে বাড়ি থেকে বেড়িয়ে পরলাম।
স্ত্রী কাছে এসে বলল, একটা বাড়ির সন্ধান পেয়েছি, ভেতরটা একেবারে টোস্টি ওয়ার্ম, দেখতে চাও ?
আমার হাত ঠাণ্ডায় জমে গেছে, আমি বললাম এক্ষুনি।
সেই বাড়িতে ঢুকেই আরচির সাথে আমার পরিচয় হলো। এই বাড়িটি আসলে একটা আর্ট গ্যালারি। পুরাতন বাড়ি নয়, নতুন। বিদ্যুৎ রয়েছে, হাই হিটিং দিয়ে রাখা হয়েছে। আরচি আমাকের স্বাগত জানিয়ে বলল, দরজাটা ভিড়িয়ে দাও, ঠান্ডা আসবে। আমার স্ত্রী একটু আগে এসে তার সাথে কথাবার্তা বলে গেছে, কিন্তু তার কিছুই মনে নেই, সাতানব্বুই বছর বয়সে মনে থাকবার কথাও নয়। আমার স্ত্রীকে সে আবার মাথা নুইয়ে স্বাগত জানালো।
আরচির সাথে কথাবার্তা বলে এবং গ্যালারির পেইন্টিংস দেখে যা বুঝলাম তা হল এই-
আর্চির মা এক ঘোড় সওয়ারী। মাত্র ষোল বছর বয়সে প্রিয় ঘোড়ায় চেপে একাই আমেরিকার কোন এক জায়গা থেকে উত্তরে যাত্রা করে, প্রেইরিতে ঘর বাধঁবে। ওগেমায় এসে মন স্থির হয়। একটি ষোড়শী মেয়ে কত প্রতিকূলতা অতিক্রম করেই মনে হয় এখানে ঘর বাঁধতে পেরেছিল। সেই ইতিহাসটা আরচির মুখ থেকেই শুনতে চাইছিলাম, কিন্তু বয়সের জন্য একসাথে অনেকক্ষণ কথা বলা তার পক্ষে সম্ভব নয়। কথা বলতে বলতে খেই হারিয়ে ফেলে। ছোট বাক্য বিনিময়ে সে ঠিক আছে। আমার মেয়েদের সাথে তার আলাপটা ভাল জমছে।
আরচির মা প্রেইরির সৌন্দর্য্যে বিমোহিত হয়েছিল, পেইন্টিিংস তার শখ, সে চেয়েছিল আজীবন প্রেইরির ছবি আঁকবে। এঁকেছেও প্রচুর। সেগুলো বেহাত হয়ে কোথায় কোথায় চলে গেছে। তার ছেলে আরচি এখন সেইসব ছবি উদ্ধার করে চলেছে। আরচি সম্পূর্ণ নিজের টাকায় এই আর্ট গ্যালারী তৈরী করেছে। যাদের কাছে আরচির মায়ের পেইন্টিংস ছিল, আরচির প্রজেক্টের কয়া শুনে তারা সেইসব পেইন্টিংস ফেরত পাঠাচ্ছে। আমরা শখানেক পেইন্টিংস দেখলাম। প্রত্যেকটা প্রফেশনাল আঁকিয়ের আঁকা পেইন্টিংস মনে হল। আরচি প্রত্যেকটা ছবির সাথে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে, কোন পেইন্টিং কোথা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে সেটা বর্ণনা করছে।
লোকজন শনি-রবিবার এই মিউজিয়াম দেখতে আসে। কারণ এই দুইদিনেই ট্রেনের প্রোগাম থাকে। আরচি প্রতি উইকএন্ডে নয়টা পাঁচটা অফিক করার মত আর্ট-গ্যালারির তত্ত্বাবধায়ন করে। এছাড়াও সপ্তাহের অন্য দিনে মিউজিয়ামে এসে কেউ যদি আরচির মায়ের আর্ট-গ্যালারি দেখতে চায় তাহলে ফোন করা মাত্র আরচি গাড়ি চালিয়ে এখানে চলে আসে। সে শহরে থাকে না,এখান থেকে বিশ মাইল দূরে একটি খামারবাড়িতে থাকে।
আমি অবাক হয়ে বললাম, তুমি এই বয়সে গাড়ি চালাও?
সে বলল, ইয়েস। গ্যালারির পাশে একটি পন্টয়াক গাড়ি পার্ক করা, সে বলল সেটিই তার গাড়ি।
এই বয়সে গাড়ি চালানোটা বাড়াবাড়ি মনে হচ্ছে। ইন্সুরেন্স কোম্পানি কোন হিসাবে তার লাইসেন্স বজায় রেখেছে মাথায় ঢুকলো না। একদিন বড় এক্সিডেন্ট হয়ে যাবে তো।
আরচির বাবা এই এলাকার মানুষ। আরচির মা তাকে বিয়ে করার পরে যে র্যাঞ্চটি তৈরি করেছিল, আরচিও সেটার দেখাশুনা করেই জীবন পার করে দেয়। এখন দেখছে আরচির এক ছেলে। তাদের সাথেই আরচি থাকে। আরচির বৌ গত হয়েছেন এক যুগের বেশি। তার কাউবয় টুপির ভিতরে তার বৌয়ের একটা ছবি আঠা দিয়ে লাগানো আছে। টুপি খুলে আরচি আমাদেরকে বৌয়ের ছবি দেখালো। বউয়ের কথা বলার সময় তার চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
আমার মেয়েরা আরচিকে বিভিন্ন প্রশ্ন করছিল।
আরচিও সিরিয়াসলি আমার মেয়েদের প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিল। আমার মেয়েদের বেশিরভাগ প্রশ্ন আরচির মাকে ঘিরে। সে কিভাবে ঘোড়া চালাতো, কিভাবে ছবি আঁকতো, কিভাবে রান্না করত- এইসব বিষয়ে প্রশ্ন। আরচি গর্ব করে মায়ের বিষয়ে কথা বলছে। মাকে বড় ভালবাসে সে।